ব্যক্তিগত গাড়ি বা মাইক্রোবাসে কোথাও যাত্রা করার সময় অধিকাংশ মানুষই আগে খোঁজেন আরামদায়ক একটি আসন। কেউ চান জানালার পাশে বসে বাইরের দৃশ্য উপভোগ করতে, আবার কেউ এমন জায়গা বেছে নিতে চান যেখানে এসির বাতাস বেশি পাওয়া যায়। কিন্তু খুব কম মানুষই ভাবেন, যে আসনটি তিনি বেছে নিচ্ছেন সেটি কতটা নিরাপদ। অথচ সড়ক দুর্ঘটনার বাস্তবতা বলছে, গাড়ির সব আসন সমানভাবে নিরাপত্তা দেয় না।
বিভিন্ন দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে অটোমোবাইল বিশেষজ্ঞরা এমন একটি আসনের কথা জানিয়েছেন, যেটি তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত হয়। বড় ধরনের দুর্ঘটনার সময়ও এই জায়গায় বসে থাকা যাত্রীর গুরুতর আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা অন্য আসনের তুলনায় কম থাকে।
মজার বিষয় হলো, এই আসনটি সাধারণত খুব বেশি জনপ্রিয় নয়। অনেক যাত্রী মনে করেন এখানে বসলে বাইরের দৃশ্য ভালো দেখা যায় না কিংবা বসার আরাম কম। কিন্তু নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এটিই গাড়ির প্রকৃত ‘সেফ জোন’ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
অটোমোটিভ প্রযুক্তিবিদ ও প্রকৌশলীদের গবেষণা অনুযায়ী, বেশির ভাগ যাত্রীর জন্য গাড়ির পেছনের সারির মাঝখানের আসনটি সবচেয়ে নিরাপদ। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর গবেষণাও এই মতের সঙ্গে একমত। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সামনের আসন বা পেছনের দুই পাশের আসনের তুলনায় মাঝখানের আসনে বসলে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে যায়।
এই আসনটি নিরাপদ হওয়ার প্রধান কারণ হলো অবস্থানগত দূরত্ব। গাড়ির চারপাশের যেসব অংশ সংঘর্ষের সময় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মাঝখানের আসনটি সেগুলো থেকে তুলনামূলকভাবে দূরে থাকে। ফলে কোনো ধাক্কা লাগলে যাত্রী সরাসরি আঘাতের মুখে পড়েন না।
গাড়ির সামনের অংশ সাধারণত এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে মুখোমুখি সংঘর্ষের সময় সেটি দুমড়েমুচড়ে গিয়ে আঘাতের বড় অংশ নিজেই গ্রহণ করতে পারে। এর ফলে যাত্রীদের ওপর ধাক্কার শক্তি কমে যায়। কিন্তু এই অংশের কাছাকাছি বসে থাকলে ঝুঁকি বেড়ে যায়। আবার গাড়ির পাশে আঘাত লাগলে দরজা বা পাশের প্যানেলের মাধ্যমে সরাসরি ধাক্কা যাত্রীর শরীরে পৌঁছে যায়। এ কারণেই দুই পাশের আসনের ঝুঁকি মাঝখানের তুলনায় বেশি।
পেছনের মাঝখানের আসনটি ড্যাশবোর্ড ও দরজা উভয় জায়গা থেকেই কিছুটা দূরে থাকে। দুর্ঘটনার প্রথম আঘাত সাধারণত এই জায়গাগুলোতেই লাগে। আধুনিক গাড়িগুলোতে মাঝখানের আসনেও শক্তিশালী সিট বেল্ট ব্যবহারের ব্যবস্থা থাকে। অনেক ক্ষেত্রে পাশের এয়ারব্যাগও মাঝখানে বসা যাত্রীকে আংশিক সুরক্ষা দিতে পারে।
সিট বেল্টের সঠিক ব্যবহার, আঘাতের উৎস থেকে দূরত্ব এবং গাড়ির মজবুত কাঠামো—এই তিনটি বিষয় মিলেই পেছনের মাঝখানের আসনটিকে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে নিরাপদ করে তোলে।
তবে গাড়ির ধরন অনুযায়ী নিরাপত্তার বিষয়টি কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। সেডান গাড়িতে পেছনের মাঝখানের আসনটি সাধারণত সবচেয়ে নিরাপদ। কারণ দুর্ঘটনার সময় সামনের এবং পাশের অংশগুলো আঘাতের বড় অংশ নিজেরা গ্রহণ করে নেয়।
অন্যদিকে এসইউভি বা পিকআপ ধরনের উঁচু গাড়ির ক্ষেত্রে পেছনের দুই পাশের আসনও মাঝখানের আসনের মতো নিরাপদ হতে পারে। কারণ এসব গাড়ির কাঠামো শক্তিশালী এবং মাটি থেকে বেশ উঁচুতে থাকে। বিশেষ করে যদি পাশের আসনগুলোতে এয়ারব্যাগ থাকে, তাহলে সেগুলোও যথেষ্ট সুরক্ষা দেয়।
মিনিভ্যানের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা দ্বিতীয় সারিকে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হিসেবে বিবেচনা করেন। এই সারিটি সামনের অংশ থেকে যথেষ্ট দূরে থাকে এবং শেষের সারির তুলনায় কম ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ তৃতীয় সারি সাধারণত গাড়ির পেছনের বাম্পারের খুব কাছাকাছি থাকে, যা পেছন থেকে ধাক্কা লাগলে বিপজ্জনক হতে পারে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি। সব গাড়ির মাঝখানের আসন একইভাবে তৈরি হয় না। কিছু গাড়িতে এই আসনটি ভাঁজ করা থাকে বা সেখানে পূর্ণাঙ্গ সিট বেল্ট থাকে না। এমন পরিস্থিতিতে মাঝখানের আসন আর নিরাপদ থাকে না। তাই যেকোনো আসনে বসার আগে সেখানে সিট বেল্ট এবং এয়ারব্যাগের সুবিধা আছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
দুর্ঘটনার ধরন অনুযায়ী গাড়ির ভেতরের ঝুঁকিও পরিবর্তিত হতে পারে। যেমন মুখোমুখি সংঘর্ষের ক্ষেত্রে সামনের আসনের তুলনায় পেছনের আসন অনেক বেশি নিরাপদ। আবার পাশ থেকে ধাক্কা লাগলে দরজার পাশে বসা যাত্রীরা বেশি বিপদের মুখে পড়েন। এই অবস্থায় মাঝখানের আসনটি সবচেয়ে বেশি সুরক্ষা দেয়।
এমনকি গাড়ি উল্টে গেলেও মাঝখানের আসনে বসা যাত্রীর দরজা বা ছাদের পিলারের সঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিকভাবে সিট বেল্ট ব্যবহার করা হলে মাঝখানের আসনে গুরুতর আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে কম।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, কেবল নিরাপদ আসনে বসাই যথেষ্ট নয়। নিরাপত্তা অনেকাংশেই নির্ভর করে সিট বেল্ট ব্যবহারের ওপর, চালকের সতর্কতার ওপর এবং গাড়ির যান্ত্রিক অবস্থার ওপর।
অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো, চালানোর সময় ফোন ব্যবহার করা বা ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। একইভাবে গাড়ির টায়ার বা ব্রেক ঠিকভাবে কাজ না করলে জরুরি মুহূর্তে বিপদ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া সঠিক ভঙ্গিতে বসাও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মাথা হেডরেস্টের সঙ্গে ঠিকভাবে ঠেকিয়ে বসতে হবে এবং ড্যাশবোর্ডে পা তুলে রাখা বা অতিরিক্ত সামনে ঝুঁকে থাকা এড়িয়ে চলতে হবে। ভুল ভঙ্গিতে বসলে সিট বেল্ট ও এয়ারব্যাগ ঠিকমতো কাজ করতে পারে না।
শিশুদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ছোটদের জন্য পেছনের মাঝখানের আসনটি সবচেয়ে নিরাপদ বলে ধরা হয়। তবে তাদের জন্য বিশেষ চাইল্ড সিট ব্যবহার করা জরুরি। যদি মাঝখানে সেই ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে পেছনের ডান পাশের আসন ব্যবহার করা সুবিধাজনক।
অন্যদিকে গাড়ির সামনের যাত্রী আসনটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ এটি ড্যাশবোর্ড ও সামনের কাচের খুব কাছাকাছি। মুখোমুখি সংঘর্ষের সময় এই আসনে থাকা যাত্রী সরাসরি আঘাতের মুখে পড়তে পারেন। শিশুদের জন্য এই আসন আরও বিপজ্জনক, কারণ এয়ারব্যাগের তীব্র ধাক্কা তাদের জন্য মারাত্মক হতে পারে।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপত্তার বিচারে গাড়ির পেছনের আসনই সবচেয়ে ভালো বিকল্প। বিশেষ করে মাঝখানের আসনটি হয়তো আরামদায়ক নয় কিংবা সেখান থেকে বাইরের দৃশ্যও খুব ভালো দেখা যায় না, কিন্তু দুর্ঘটনার ঝুঁকি বিবেচনায় এটিই সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।





Add comment