শীত বিদায়ের পর প্রকৃতিতে আসে বসন্তের সজীবতা। চারদিকে নতুন পাতা, রঙিন ফুল আর প্রাণবন্ত পরিবেশ প্রকৃতিকে করে তোলে আরও মনোরম। তবে এই সুন্দর ঋতু অনেক মানুষের জন্য নিয়ে আসে ভিন্ন এক অস্বস্তি। বসন্তকালেই অ্যালার্জির প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, যার ফলে অনেকেই হাঁচি, সর্দি কিংবা চোখ চুলকানোর মতো সমস্যায় ভুগতে থাকেন।
বসন্তের সময় প্রকৃতিতে গাছপালা, ফুল ও ঘাসে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়। এই সময় গাছ ও ঘাস থেকে প্রচুর পরিমাণে পরাগরেণু বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এসব ক্ষুদ্র কণিকা বাতাসের মাধ্যমে চারদিকে ভেসে বেড়ায় এবং মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে। অনেক মানুষের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা এই পরাগরেণুকে ক্ষতিকর উপাদান হিসেবে শনাক্ত করে, যার ফলে শরীরে অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। এই কারণেই বসন্তকালকে অনেক সময় মৌসুমি অ্যালার্জির অন্যতম প্রধান সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
শুধু পরাগরেণুই নয়, বসন্তকালে পরিবেশে আরও কিছু উপাদান অ্যালার্জির সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। ধুলাবালু, ছত্রাকের স্পোর বা পোষা প্রাণীর লোমও অনেক সময় অ্যালার্জির উপসর্গকে তীব্র করে তোলে। বিশেষ করে যাঁদের শরীর এসব উপাদানের প্রতি সংবেদনশীল, তাঁদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও বেশি দেখা দেয়।
বসন্তের অ্যালার্জির লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ সর্দি-কাশির সঙ্গে মিল থাকলেও কিছু পার্থক্য স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত বারবার হাঁচি দেওয়া, নাক দিয়ে পানি পড়া কিংবা নাক বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যায় ভোগেন। পাশাপাশি চোখ লাল হয়ে যাওয়া, চোখে চুলকানি, গলা খুসখুস করা কিংবা অস্বস্তি অনুভব করা এ ধরনের অ্যালার্জির সাধারণ লক্ষণ। কখনো কখনো মাথাব্যথা বা ক্লান্তিও দেখা দিতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে, বিশেষ করে যখন বাতাসে পরাগরেণুর পরিমাণ বেশি থাকে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বসন্তকালে অ্যালার্জি থেকে সুরক্ষিত থাকতে কিছু সাধারণ সতর্কতা অনুসরণ করা জরুরি। বাইরে থেকে ঘরে ফেরার পর হাত-মুখ ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া উচিত, যাতে শরীরে লেগে থাকা ধুলা বা পরাগরেণু পরিষ্কার হয়ে যায়। বাইরে গেলে সানগ্লাস কিংবা মাস্ক ব্যবহার করলে চোখ ও নাকে এসব কণিকার প্রবেশ কিছুটা কমানো সম্ভব।
এ ছাড়া বাসাবাড়ির পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় দরজা-জানালা খোলা রাখলে বাইরে থেকে ধুলা ও পরাগরেণু ঘরে ঢুকে পড়তে পারে। তাই প্রয়োজন ছাড়া জানালা খোলা না রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি নিয়মিত বিছানার চাদর ও বালিশের কভার ধুয়ে পরিষ্কার রাখা উপকারী, কারণ এসব জায়গায় ধুলা বা অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী কণিকা জমে থাকতে পারে।
যাঁদের অ্যালার্জির সমস্যা তুলনামূলক বেশি, তাঁদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহার করা প্রয়োজন হতে পারে। অনেক সময় অ্যান্টিহিস্টামিন ধরনের ওষুধ বা নাকের স্প্রে অ্যালার্জির উপসর্গ কমাতে সহায়তা করে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ধরনের ওষুধ নিজের সিদ্ধান্তে না খেয়ে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর ঋতুগুলোর একটি বসন্ত। চারদিকে ফুলের রঙ, নতুন পাতার সবুজ আর নির্মল পরিবেশ মানুষের মনকে আনন্দে ভরিয়ে তোলে। তবে অ্যালার্জির ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকলে এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চললে এই ঋতুর সৌন্দর্য উপভোগ করা আরও সহজ হয়ে ওঠে। তাই অ্যালার্জির লক্ষণ দেখা দিলে তা অবহেলা না করে যথাযথ সতর্কতা ও চিকিৎসা গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।





Add comment