কানাডায় চাকরির বাজারে বড় ধাক্কা

২০২৬ সালের শুরুতেই কানাডার শ্রমবাজারে বড় ধাক্কার ইঙ্গিত মিলেছে। বছরের প্রথম দুই মাসে দেশটিতে এক লাখেরও বেশি পূর্ণকালীন চাকরি হারিয়ে গেছে। এতে করে সরকারের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বেড়েছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্কের প্রভাব থেকে অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টার মধ্যেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

শুক্রবার প্রকাশিত সর্বশেষ শ্রমবাজারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কানাডার বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে। উন্নত অর্থনীতির জি–৭ দেশগুলোর মধ্যে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এই তালিকায় কেবল ফ্রান্সের বেকারত্বের হার কানাডার চেয়ে বেশি।

ফেব্রুয়ারি মাসে কর্মসংস্থানের যে বড় পতন দেখা গেছে, তা কোভিড–১৯ মহামারির পর সবচেয়ে বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গত বছরের শেষ দিকে যে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, সাম্প্রতিক এই পতনে তার বড় অংশই কার্যত মুছে গেছে। বিশেষ করে পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক পদক্ষেপ কানাডার অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ও চাপ তৈরি করছে। শুক্রবার নরওয়ে সফরকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, যদিও কর্মসংস্থানে সংকট দেখা দিয়েছে, তবুও দেশজুড়ে সামগ্রিকভাবে মজুরি বৃদ্ধির প্রবণতা রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালের মার্চে দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের বেকারত্বের হার ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা বর্তমানে সামান্য কম।

তবে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ সর্বশেষ চাকরির পরিসংখ্যানকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টিও এ প্রতিবেদনকে দেশের জন্য ‘খুবই খারাপ খবর’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

বিরোধী দলের নেতা শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে আন্তর্জাতিক কারণ যেমন রয়েছে, তেমনি সরকারের নীতিনির্ধারণও দায়ী। তাঁর মতে, বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতি নিয়ে সব দেশই চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে, কিন্তু কানাডার অর্থনীতি যেভাবে সংকুচিত হচ্ছে তা উদ্বেগের বিষয়। তিনি আরও বলেন, অন্য দেশগুলোও একই ধরনের শুল্কের মুখে পড়েছে, কিন্তু তাদের অর্থনীতিতে কানাডার মতো সংকোচন দেখা যাচ্ছে না।

বিরোধী দলীয় নেতা শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। সফরের সময় তিনি গাড়ি শিল্পের শীর্ষ নির্বাহীদের পাশাপাশি আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে জানিয়েছেন। মূলত চলমান কানাডা–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য বিরোধ নিয়ে তাঁর দলের অবস্থান তুলে ধরাই হবে এই সফরের লক্ষ্য।

গত বছর দায়িত্ব গ্রহণের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন কানাডার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে শুল্ক আরোপ করে। এর মধ্যে গাড়ি শিল্প, ইস্পাত এবং অ্যালুমিনিয়াম খাত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব শুল্কের ফলে ইতোমধ্যে হাজার হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিস্তৃত পরিসরে নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যার মধ্যে বিশ্বব্যাপী ১০ শতাংশের একটি নতুন আমদানি শুল্কও রয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের উত্তর আমেরিকান বাণিজ্য চুক্তি ইউএসএমসিএর কারণে কানাডার অনেক পণ্য এসব শুল্ক থেকে আপাতত সুরক্ষা পেয়েছে।

কিন্তু বর্তমানে এই চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। চলতি বছর চুক্তিটির বাধ্যতামূলক পর্যালোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব থেকে ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে চুক্তিটি বাতিল করা হতে পারে কিংবা কানাডা ও মেক্সিকোর সঙ্গে আলাদা বাণিজ্য চুক্তির পথ বেছে নেওয়া হতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই অনিশ্চয়তাই কানাডার শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সিআইবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের এক জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ বলেন, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে উদ্বেগজনক। এতে দেখা যাচ্ছে শ্রমবাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে এবং বাণিজ্য অনিশ্চয়তার কারণে অর্থনৈতিক কার্যক্রম অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র কানাডার সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। ফলে মার্কিন শুল্ক নীতির প্রভাব দেশটির অর্থনীতিতে সরাসরি পড়ে। এক সময় কানাডার মোট পণ্যের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হতো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই হার কিছুটা কমে প্রায় ৬৭ শতাংশে নেমে এসেছে বলে পরিসংখ্যানে দেখা গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাণিজ্য অনিশ্চয়তা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে কানাডার শ্রমবাজার এখন একটি কঠিন সময় পার করছে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed