ইফতারের টেবিলে ফলমূল ও কাঁচা সবজির সালাদ রাখার পরামর্শ দিয়ে থাকেন পুষ্টিবিদরা। ভাজাপোড়া খাবারের তুলনায় এ ধরনের খাবার শরীরের জন্য অনেক বেশি উপকারী। এগুলো খেলে শরীর হালকা থাকে এবং পেটও আরাম পায়। পুষ্টিগুণে ভরপুর এমন সবজির তালিকায় গাজরের নাম অন্যতম। তবে অনেকের মধ্যেই একটি প্রশ্ন ঘোরে, গাজর কি কাঁচা খাওয়াই বেশি উপকারী, নাকি সেদ্ধ বা ভাপিয়ে খেলে এর পুষ্টিগুণ বেশি পাওয়া যায়।
গাজর এমন একটি সবজি যা সালাদে ব্যবহার করা ছাড়াও সহজেই টুকরা করে কাঁচা খাওয়া যায়। অনেকেই কাঁচা গাজর খেতে পছন্দ করেন, আবার কেউ কেউ কাঁচা গাজর হজমে সমস্যা অনুভব করেন বলে সেদ্ধ বা ভাপানো গাজর খান। সাধারণভাবে সেদ্ধ গাজর তুলনামূলক দ্রুত হজম হয়। এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের কুমুদিনী সরকারি কলেজের গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের প্রধান জানান, গাজর কাঁচা বা সেদ্ধ যেভাবেই খাওয়া হোক, উভয় পদ্ধতিরই কিছু ভালো ও সীমাবদ্ধ দিক রয়েছে।
গাজরের অন্যতম প্রধান পুষ্টি উপাদান হলো বিটা ক্যারোটিন। এই উপাদানটি শরীরে গিয়ে ভিটামিন এ-তে রূপান্তরিত হয়। ভিটামিন এ চোখের সুস্থতা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষজ্ঞের মতে, গাজর যদি সেদ্ধ করে বা ভাপিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে শরীরের জন্য বিটা ক্যারোটিন থেকে ভিটামিন এ তৈরি করা তুলনামূলক সহজ হয়। তবে কাঁচা গাজর খেলেও শরীর প্রয়োজনীয় ভিটামিন এ পেতে পারে। অর্থাৎ কাঁচা খেলে এই পুষ্টি উপাদান একেবারেই পাওয়া যাবে না, এমন নয়।
অন্যদিকে গাজরে থাকা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ভিটামিন সি। এই ভিটামিন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। কিন্তু ভিটামিন সি তাপের সংস্পর্শে এলে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। ফলে গাজর যদি সেদ্ধ করা হয় বা ভাপানো হয়, তাহলে এর ভিটামিন সি-এর একটি বড় অংশ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই যারা গাজর থেকে পূর্ণমাত্রায় ভিটামিন সি পেতে চান, তাদের জন্য কাঁচা গাজর খাওয়াই বেশি উপকারী।
গাজর কাঁচা বা সেদ্ধ খাওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গ্লাইসেমিক ইনডেক্স। সহজভাবে বলতে গেলে, কোনো খাবারে থাকা শর্করা রক্তে কত দ্রুত শোষিত হবে তা বোঝার একটি পরিমাপক হলো গ্লাইসেমিক ইনডেক্স। গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বেশি হলে খাবার খাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায় এবং কিছু সময় পর আবার দ্রুত কমেও যায়। এই ওঠানামা স্বাস্থ্যের জন্য খুব একটা ভালো নয়, বিশেষ করে যারা ডায়াবেটিসে ভুগছেন তাদের জন্য। গাজর সেদ্ধ বা ভাপানো হলে এর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কিছুটা বেড়ে যায়। ফলে এই দিক বিবেচনায় কাঁচা গাজর খাওয়াই তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাস্থ্যকর বলে মনে করা হয়।
গাজরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এতে থাকা খাদ্য আঁশ। কাঁচা গাজরে থাকা আঁশ শরীরের জন্য খুবই উপকারী। এটি হজম প্রক্রিয়া উন্নত করতে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে রমজান মাসে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের কারণে অনেকেই কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় ভোগেন। এ সময় কাঁচা গাজর খেলে সেই সমস্যা কিছুটা কমতে পারে।
পর্যাপ্ত আঁশ গ্রহণ করলে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়। একই সঙ্গে এটি রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতেও সহায়তা করে। তবে গাজর সেদ্ধ করা বা ভাপিয়ে নেওয়ার ফলে এর আঁশের কার্যকারিতা কিছুটা কমে যেতে পারে। ফলে আঁশের পূর্ণ উপকার পেতে চাইলে কাঁচা গাজর খাওয়াই বেশি উপকারী।
সব দিক বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গাজর কাঁচা খাওয়াই সবচেয়ে ভালো। তবে সবার শরীর একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় না। কারও কারও ক্ষেত্রে কাঁচা গাজর হজমে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। তাই যদি কেউ কাঁচা গাজর খেতে না পারেন, তাহলে সেদ্ধ বা ভাপানো অবস্থায় খেতেও কোনো সমস্যা নেই।
যদিও সেদ্ধ করার সময় কিছু ভিটামিন সি নষ্ট হয়ে যায়, তবুও তা খুব বড় কোনো সমস্যা নয়। কারণ ভিটামিন সি-এর চাহিদা সহজেই অন্য টক ফল বা খাবার থেকে পূরণ করা সম্ভব। একইভাবে খাদ্য আঁশের প্রয়োজনীয়তাও অন্য আঁশসমৃদ্ধ খাবার থেকে পাওয়া যায়।
তবে যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের বিষয়টি একটু বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত। তবুও এর মানে এই নয় যে সেদ্ধ বা রান্না করা গাজর একেবারেই খাওয়া যাবে না। মূল বিষয় হলো, যেভাবেই হোক পুষ্টিকর এই সবজিটি খাদ্যতালিকায় রাখা।





Add comment