ছোট দোকানদারদের জন্য কঠিন বাজার প্রতিযোগিতা

যুক্তরাষ্ট্রের বড় সুপারমার্কেট চেইনগুলোর তুলনায় ছোট মুদি দোকানগুলোর জন্য বাজারে টিকে থাকা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। মূল্য নির্ধারণের বৈষম্য এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্পষ্টতার কারণে স্বাধীন খুচরা ব্যবসায়ীরা বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ উঠছে।

নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে একটি মুদি দোকানের মালিক সম্প্রতি বিষয়টি সামনে এনেছেন। নিজের দোকানের তাক ঘুরে দেখাতে গিয়ে তিনি একটি জনপ্রিয় ব্রেকফাস্ট সিরিয়ালের বাক্স দেখিয়ে জানান, এই পণ্যটি দোকানে তুলতে তাকে পরিবেশকের কাছে প্রায় ৫ ডলার দিতে হয়। অথচ দেশের বড় সুপারমার্কেট চেইনগুলো একই পণ্য প্রায় একই দামে গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করতে পারে।

তার মতে, এমন পরিস্থিতিতে ছোট দোকানগুলোর পক্ষে প্রতিযোগিতা করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রায় দেড় দশক আগে তিনি ব্যস্ত এক মোড়ে তার মুদি দোকানটি চালু করেন। কিন্তু এখন বড় খুচরা চেইনগুলোর সরাসরি নির্মাতাদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বিশেষ মূল্য সুবিধা থাকার কারণে ছোট ব্যবসাগুলো ক্রমাগত চাপের মুখে পড়ছে।

তিনি বলেন, বড় চেইন স্টোরগুলো সরাসরি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা বিশেষ বা অগ্রাধিকারমূলক মূল্য পায়। এই সুবিধার কারণে বাজারে প্রতিযোগিতা ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

এ ধরনের চাপ শুধু একটি দোকানের ক্ষেত্রেই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে হাজারো স্বাধীন মুদি দোকান একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। দেশটিতে এমন দোকানের সংখ্যা ২১ হাজারেরও বেশি এবং সামগ্রিক মুদি পণ্যের বিক্রির প্রায় এক তৃতীয়াংশ এই খাতের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।

এই মূল্য বৈষম্যের বিষয়টি সামনে আনতে দুই বছর আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে সাক্ষ্য দেন। ব্যবসা প্রশাসন নিয়ে পড়াশোনা করার সময় ছোট ব্যবসা সংগঠনগুলোর সঙ্গে যে যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল, তার মাধ্যমেই তিনি এই সুযোগ পান।

তিনি মনে করেন, একজন কলেজশিক্ষিত নাগরিক হিসেবে ছোট ব্যবসায়ীদের সমস্যাগুলো তুলে ধরা তার দায়িত্ব। তার বাবা এবং চাচারা অভিবাসী ছিলেন এবং তারা এতটা নিরাপদ বোধ করতেন না বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তার পরিবারের ব্যবসার সূচনা হয়েছিল ১৯৭১ সালে। তখন ব্রুকলিনের ডাউনটাউনে একটি উপহারের দোকান দিয়ে শুরু হয়েছিল এই উদ্যোগ। পরে সেটি মুদি ব্যবসায় রূপ নেয়।

২০২৪ সালের মে মাসে সিনেটের ব্যাংকিং, হাউজিং অ্যান্ড আরবান অ্যাফেয়ার্স কমিটির সামনে দেওয়া সাক্ষ্যে তিনি পরিবেশকদের কাছ থেকে আসা “অস্থির ও অস্পষ্ট মূল্য কাঠামো” নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, অনেক গ্রাহক এমন পরিস্থিতিতে একদিনের জন্য গাড়ি ভাড়া করে বড় খুচরা চেইন যেমন কস্টকো বা ট্রেডার জো’স থেকে কেনাকাটা করতে যান, কারণ সেখানে দাম তুলনামূলকভাবে কম পড়ে।

প্রায় দুই বছর পর নিজের দোকানের বেজমেন্ট অফিসে বসে তিনি বলেন, পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। তার চারপাশে তখন আরেকটি মুদি দোকানের প্যাক করা বাক্স পড়ে ছিল, যেটি ব্যয়বৃদ্ধির কারণে কয়েক সপ্তাহ আগে বন্ধ করতে হয়েছে।

এদিকে ছোট ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে কী ধরনের নীতি বা নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা প্রয়োজন তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে জোর আলোচনা চলছে। একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা জানান, মূল্য বৈষম্য বর্তমানে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি। এই সমস্যা শুধু মুদি দোকানেই নয়, স্বাধীন বইয়ের দোকান, স্থানীয় ফার্মেসি এবং অন্যান্য অনেক খাতেও প্রভাব ফেলছে।

তার মতে, এমন একটি শিল্পে যেখানে লাভের পরিমাণ খুবই কম, সেখানে মূল্য বৈষম্য ছোট ব্যবসার জন্য মারাত্মক চ্যালেঞ্জ তৈরি করে এবং শেষ পর্যন্ত অনেক দোকান বন্ধ হয়ে যেতে বাধ্য হয়।

সমাধানের অংশ হিসেবে তিনি ১৯৩৬ সালের একটি আইন কার্যকর করার কথা উল্লেখ করেন, যা বিক্রেতাদের নির্দিষ্ট ক্রেতাদের জন্য বিশেষ মূল্য সুবিধা দেওয়া নিষিদ্ধ করে। মহামন্দার সময় প্রণীত এই আইনটি দীর্ঘদিন প্রয়োগ না হলেও সাম্প্রতিক সময়ে আবার আলোচনায় আসে।

সাবেক প্রশাসনের সময় এ আইনের আওতায় দুটি মামলা করা হয়েছিল, যার একটি বড় অ্যালকোহল পরিবেশকের বিরুদ্ধে এবং অন্যটি একটি বহুজাতিক খাদ্য ও পানীয় কোম্পানির বিরুদ্ধে। প্রথম মামলাটি এখনো চলমান থাকলেও দ্বিতীয়টি পরে খারিজ হয়ে যায়।

অন্যদিকে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করলে ভোক্তাদের জন্য দাম বাড়তে পারে। নিউইয়র্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক বলেন, ছোট খুচরা ব্যবসায়ীদের সহায়তার জন্য কর এবং নিয়ন্ত্রক চাপ কমানো আরও কার্যকর হতে পারে।

তবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা দাবি করেন, আইনটি প্রয়োগ করলে ক্ষতির প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

দোকান মালিকের মতে, সরবরাহকারীদের কাছ থেকে ভালো মূল্য পাওয়ার সহজ কোনো সমাধান তার চোখে নেই। কখনো কখনো তার কর্মীরা বড় চেইন দোকান থেকে অফারের পণ্য কিনে এনে দোকানে বিক্রি করেন, কারণ সেগুলো সরাসরি পরিবেশকের কাছ থেকে কেনার চেয়েও সস্তা পড়ে।

তার মতে, বড় খুচরা চেইনগুলোর সঙ্গে নির্মাতাদের সরাসরি যোগাযোগ থাকার কারণে ছোট ব্যবসাগুলো স্পষ্টভাবে অসুবিধায় পড়ে।

তিনি মনে করেন, মূল্য নির্ধারণে আরও স্বচ্ছতা এবং বড় ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ বাড়ানো হলে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হতে পারে। গত বছর তিনি একটি বহুজাতিক খাদ্য কোম্পানি এবং তাদের স্ন্যাকস ব্র্যান্ডের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন, তবে সঠিক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতেই তাকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে।

তার ভাষায়, অন্য কোনো ছোট ব্যবসায়ীর জন্য এই যোগাযোগ আরও কঠিন হতে পারে, বিশেষ করে যদি তাদের কাছে পর্যাপ্ত সময় বা কাঠামোগত সহায়তা না থাকে।

শেষ পর্যন্ত তিনি বলেন, ছোট ব্যবসা সমাজের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা নিয়ে সামষ্টিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। যদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় ব্যবসার বিকাশ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়, তবে এই খাতের জন্য আরও শক্তিশালী সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed