কখনো কি এমন মনে হয়েছে যে আপনি যেন নিজের শরীরের ভেতরে নেই, বরং বাইরে থেকে সবকিছু দেখছেন? আবার কখনো চারপাশের পরিবেশ অস্বাভাবিক বা অবাস্তব মনে হতে পারে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এমন অভিজ্ঞতাকে বলা হয় ডিসোসিয়েশন।
জীবনের কোনো না কোনো সময় অনেক মানুষের মধ্যেই এ ধরনের অভিজ্ঞতা দেখা দিতে পারে। সহজভাবে বলতে গেলে, ডিসোসিয়েশন এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে একজন ব্যক্তি নিজের অনুভূতি, স্মৃতি, শরীর কিংবা আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে সংযোগ কিছুটা হারিয়ে ফেলেন বা বিচ্ছিন্ন অনুভব করেন।
কখনো এটি স্বল্প সময়ের জন্য ঘটে এবং তা স্বাভাবিক মানসিক প্রতিক্রিয়া হিসেবেই দেখা যায়। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং তখন সেটি ‘ডিসোসিয়েটিভ ডিজঅর্ডার’ নামে পরিচিত মানসিক সমস্যার অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
ডিসোসিয়েশন হলে অনেকেই অনুভব করেন যে নিজের সঙ্গে বা চারপাশের পৃথিবীর সঙ্গে সংযোগ যেন দুর্বল হয়ে গেছে। এমন অবস্থায় মনে হতে পারে শরীরটা যেন নিজের নয়, চারপাশের পরিবেশ অবাস্তব বা অচেনা লাগছে কিংবা নিজের জীবনটাকে যেন দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে সবার অভিজ্ঞতা একই রকম হয় না।
অনেক সময় তীব্র মানসিক চাপ বা আঘাতজনিত ঘটনার সময় মন নিজেকে সামলে নিতে এমন প্রতিক্রিয়া দেখায়। অর্থাৎ অতিরিক্ত মানসিক চাপ মোকাবিলার একটি উপায় হিসেবেও ডিসোসিয়েশন কাজ করতে পারে।
দৈনন্দিন জীবনেও এর হালকা অভিজ্ঞতা দেখা যায়। যেমন কোনো বই বা সিনেমায় এতটাই ডুবে যাওয়া যে আশপাশের বিষয় ভুলে যাওয়া। আবার পরিচিত পথে গাড়ি চালিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়ার পর মনে না থাকা কীভাবে সেখানে পৌঁছালেন। এসব ঘটনাও সাধারণ ধরনের ডিসোসিয়েশনের উদাহরণ।
কিছু ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের জন্য থাকতে পারে। আবার কারও কারও ক্ষেত্রে তা সপ্তাহ বা মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। বিশেষ করে ছোটবেলায় কঠিন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়া কিছু মানুষ পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে অবচেতনভাবে নিজেকে মানসিকভাবে ‘বিচ্ছিন্ন’ রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন।
অনেক মানুষের ক্ষেত্রে ডিসোসিয়েশন ট্রমার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যায়। হঠাৎ কোনো ভয়াবহ ঘটনা, দীর্ঘদিনের নির্যাতন বা তীব্র মানসিক আঘাত এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। কখনো এটি তীব্র চাপের পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি মানসিক প্রতিরক্ষা পদ্ধতি হিসেবেও কাজ করে।
কিছু মানসিক সমস্যার লক্ষণ হিসেবেও ডিসোসিয়েশন দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার বা পিটিএসডি, বিষণ্নতা, উদ্বেগজনিত সমস্যা, সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিজঅর্ডার এবং বর্ডারলাইন পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার।
এ ছাড়া কিছু সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় অনুশীলনের সময়ও মানুষ কখনো এমন অনুভূতি পেতে পারেন। আবার অ্যালকোহল সেবন, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা হঠাৎ কোনো ওষুধ বন্ধ করার ফলেও এমন অভিজ্ঞতা দেখা যেতে পারে।
ডিসোসিয়েশন নানা ধরনের অনুভূতির মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে। অনেক সময় ব্যক্তিগত স্মৃতির ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা যায়। জীবনের কিছু ঘটনার স্মৃতি মনে না থাকা বা নিজের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মনে না পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আগে যেসব কাজ সহজে করা যেত, তা কীভাবে করতে হয় সেটিও ভুলে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে। এমন অভিজ্ঞতাকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা ‘ডিসোসিয়েটিভ অ্যামনেশিয়া’ বলে উল্লেখ করেন।
কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় কেউ হঠাৎ অন্য কোথাও চলে গেছেন এবং মনে করতে পারছেন না কীভাবে সেখানে পৌঁছেছেন। এমনকি সেই সময় নিজের পরিচয় নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে বা নতুন পরিচয় গ্রহণ করতে পারেন। এ অবস্থাকে বলা হয় ‘ডিসোসিয়েটিভ ফিউগ’।
কখনো মানুষের কাছে চারপাশের পৃথিবী অস্বাভাবিক বা স্বপ্নের মতো মনে হতে পারে। জিনিসপত্রের রং বা আকার ভিন্ন লাগতে পারে, পরিবেশ কুয়াশাচ্ছন্ন বা প্রাণহীন মনে হতে পারে। যেন কাচের আড়াল থেকে সবকিছু দেখা হচ্ছে। এ ধরনের অভিজ্ঞতাকে বলা হয় ‘ডিরিয়ালাইজেশন’।
আবার কখনো মনে হতে পারে যেন নিজের জীবনকে বাইরে থেকে দেখছেন। নিজের আবেগ বা শরীরের সঙ্গে সংযোগ কমে গেছে বলে মনে হতে পারে। এ ধরনের অনুভূতিকে বলা হয় ‘ডিপারসোনালাইজেশন’।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ব্যক্তিত্বের ভেতরে ভিন্ন ভিন্ন অংশের উপস্থিতি অনুভূত হতে পারে। কণ্ঠস্বর বা কথা বলার ধরন বদলে যেতে পারে এবং কখনো অন্য নামে পরিচয় দেওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা এটিকে ‘আইডেনটিটি অলটারেশন’ বলে থাকেন।
আরেকটি অভিজ্ঞতা হলো নিজের পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়া। ব্যক্তি বুঝতে পারেন না তিনি আদতে কেমন মানুষ বা তাঁর ব্যক্তিত্ব কেমন। মতামত, পছন্দ বা বিশ্বাস বারবার বদলে যাচ্ছে বলে মনে হতে পারে। এ অবস্থাকে বলা হয় ‘আইডেনটিটি কনফিউশন’।
ডিসোসিয়েশনের সঙ্গে ‘ট্রিগার’ ও ‘ফ্ল্যাশব্যাক’ বিষয়টিও সম্পর্কিত হতে পারে। ট্রিগার এমন কিছু যা অতীতের কোনো ট্রমাটিক অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দেয়। এটি কোনো শব্দ, গন্ধ, দৃশ্য, স্বাদ, স্পর্শ বা বিশেষ পরিস্থিতি হতে পারে।
এই ট্রিগারের কারণে কখনো ফ্ল্যাশব্যাক ঘটে, যেখানে ব্যক্তি হঠাৎ অতীতের ভয়াবহ ঘটনার অভিজ্ঞতাকে যেন বর্তমানেই ঘটছে বলে অনুভব করেন। তখন মনে হতে পারে তিনি যেন আবার সেই ঘটনার ভেতরে ফিরে গেছেন।
ডিসোসিয়েশনের জন্য নির্দিষ্ট কোনো একক ওষুধ নেই। তবে অনেক ক্ষেত্রে ওষুধ ও মনোচিকিৎসার সমন্বিত ব্যবস্থায় অবস্থার উন্নতি করা সম্ভব। লক্ষণের তীব্রতা ও এর পেছনের কারণ বিবেচনা করে চিকিৎসক চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করেন।
চিকিৎসায় সাধারণত মনোচিকিৎসা বা সাইকোথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মধ্যে কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি, হিপনোথেরাপি এবং ট্রমাকেন্দ্রিক ধাপভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহৃত হতে পারে। পাশাপাশি ডায়ালেকটিক্যাল বিহেভিয়ার থেরাপি এবং আই মুভমেন্ট ডিসেনসিটাইজেশন অ্যান্ড রিপ্রসেসিং পদ্ধতিও ব্যবহৃত হয়।
অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সমর্থনও চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চিকিৎসক প্রয়োজনে বিষণ্নতা কমানোর ওষুধ, মুড স্থিতিশীল রাখার ওষুধ বা উদ্বেগ ও ঘুমের সমস্যার জন্য কিছু ওষুধ দিতে পারেন। কিছু পরিস্থিতিতে অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধও প্রয়োজন হতে পারে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, ডিসোসিয়েশন এমন এক অভিজ্ঞতা যেখানে মানুষ নিজের শরীর, অনুভূতি বা চারপাশের পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্নতা অনুভব করতে পারেন। এর সঙ্গে স্মৃতির ফাঁক, সময়ের অনুভূতির পরিবর্তন কিংবা তীব্র ফ্ল্যাশব্যাকও যুক্ত থাকতে পারে। তবে সঠিক সহায়তা ও চিকিৎসা পেলে অনেকেই ধীরে ধীরে এই অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সক্ষম হন।





Add comment