আগামীকাল ১২ মার্চ পালিত হবে বিশ্ব কিডনি দিবস। চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, কিডনির অনেক রোগই দীর্ঘ সময় পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ ছাড়াই শরীরে বাসা বাঁধে। ফলে একজন মানুষ নিজেকে পুরোপুরি সুস্থ মনে করলেও অজান্তেই তার শরীরে জটিলতা তৈরি হতে পারে। অনেক সময় হঠাৎ করেই পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে ওঠে। আবার কিছু সাধারণ কারণ থেকেও কিডনির বিভিন্ন রোগের সূচনা হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনির রোগ যেকোনো বয়সের মানুষের মধ্যেই দেখা দিতে পারে। অনেকেই দৈনন্দিন জীবনে সুস্থভাবেই চলাফেরা করেন, কিন্তু ধীরে ধীরে তাদের কিডনির কার্যক্ষমতা কমতে থাকে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে তখন নিয়মিত ডায়ালাইসিস কিংবা কিডনি প্রতিস্থাপনের মতো চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে কিডনির রোগ দ্রুত শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সচেতনভাবে নিজের কাছে প্রশ্ন তোলা জরুরি, কিডনি আদৌ সুস্থ আছে কি না।
ঝুঁকি সম্পর্কে জানা প্রয়োজন
অনেকেই মনে করেন, রক্তে ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা করালেই কিডনির কার্যক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে চিকিৎসকদের মতে, এটি কিডনি সমস্যার প্রাথমিক শনাক্তকরণের প্রধান পরীক্ষা নয়। বরং প্রস্রাবের সঙ্গে অ্যালবুমিন বা আমিষ বের হচ্ছে কি না, তা নির্ণয় করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রেও বছরে অন্তত একবার এই পরীক্ষা করানো প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
এর পাশাপাশি রক্তের শর্করা এবং রক্তচাপের অবস্থা জানা জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে কোনো উপসর্গ ছাড়াই একজন মানুষ ডায়াবেটিস কিংবা উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হতে পারেন। এই দুটি রোগ থাকলে কিডনির সমস্যার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের অন্যতম প্রধান কারণ অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস।
চিকিৎসকদের মতে, হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্ষমতা কমে গেলেও কিডনির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশে নিয়মিত এসব পরীক্ষা করানোর প্রবণতা এখনো তেমন গড়ে ওঠেনি। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও বেশি অবহেলিত থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব রোগ সম্পর্কে আগে থেকেই জানা থাকলে জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়। প্রয়োজনে চিকিৎসা নেওয়ার মাধ্যমে কিডনি সমস্যার ঝুঁকি যেমন কমানো যায়, তেমনি অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকিও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
ওজন ও পারিবারিক ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ
নিজের উচ্চতার তুলনায় ওজন ঠিক আছে কি না, সেটিও জানা প্রয়োজন। অতিরিক্ত ওজন অনেক সময় বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি পরিবারের নিকটাত্মীয়দের কারও দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের ইতিহাস থাকলে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, নারীদের গর্ভধারণের আগে রক্তে ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ। এতে আগেভাগেই কিডনির অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
ব্যথানাশক ওষুধে বাড়তে পারে ক্ষতি
দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন ধরনের ব্যথা থেকে দ্রুত মুক্তি পেতে অনেকেই নিয়মিত ব্যথানাশক ওষুধ গ্রহণ করেন। অনেক সময় দীর্ঘদিনের পিঠব্যথা বা শরীরের বিভিন্ন ব্যথার পেছনে মূল কারণ হয়ে থাকে ভুল দেহভঙ্গি। বসা, ভারী জিনিস তোলা কিংবা শোয়ার সময় শরীরের ভঙ্গি ঠিক না থাকলে এসব ব্যথা দীর্ঘদিন স্থায়ী হতে পারে।
কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করলে সাময়িক স্বস্তি মিললেও তা কিডনির জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। একইভাবে গাছগাছড়া থেকে তৈরি বা অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রস্তুত কিছু ওষুধও কিডনির ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পানিশূন্যতা থেকেও বিপদ
পানিশূন্যতা কিডনির সমস্যার আরেকটি বড় কারণ। শরীরে পানির ঘাটতি তৈরি হলে অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরির মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে সময়মতো চিকিৎসা নিলে এই সমস্যা অনেক ক্ষেত্রেই পুরোপুরি সেরে ওঠে। যদিও কখনো কখনো জীবন রক্ষার জন্য সাময়িকভাবে ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাতলা পায়খানা বা বমির মতো সমস্যায় শরীরে দ্রুত পানি ও লবণের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। যদি এ সময় নিয়মমাফিক ওরস্যালাইন বা পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ না করা হয়, তাহলে মারাত্মক পানিশূন্যতার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাই সাধারণ এই ঝুঁকি থেকে বাঁচতে ঘরে সবসময় ওরস্যালাইনের প্যাকেট হাতের কাছে রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা ব্যবহার করা জরুরি বলে পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।





Add comment