যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন সংক্রান্ত একটি ঘটনাকে ঘিরে তীব্র সমালোচনা ও রাজনৈতিক আলোচনার পর অবশেষে মুক্তি পেয়েছে এক কিশোর মারিয়াচি সংগীতশিল্পী এবং তার পরিবার। কংগ্রেস সদস্যদের চাপ ও জনমতের প্রতিক্রিয়ার মুখে সোমবার ওই তরুণকে আটক কেন্দ্র থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর কয়েকশ মাইল দূরে থাকা তার পরিবারের সদস্যদেরও মুক্তি দেওয়া হয়।
১৮ বছর বয়সী এই তরুণ টেক্সাসের ম্যাকঅ্যালেন শহরের এক উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং দক্ষ মারিয়াচি ট্রাম্পেটবাদক। তিনি এবং তার পরিবার অভিবাসন সংক্রান্ত নিয়মিত চেক-ইনের জন্য হাজির হলে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ওই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
টেক্সাসের একজন রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য এক বিবৃতিতে জানান, তিনি ওই তরুণের মুক্তি নিশ্চিত করতে পেরেছেন। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেকজন ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য জানান, ডিলি শহরের পরিবারভিত্তিক আটক কেন্দ্র থেকে ওই পরিবারের সদস্যদেরও মুক্তি দেওয়া হয়েছে এবং তারা তাদের গ্রহণ করেছেন।
গ্রেপ্তারের সময় তরুণটিকে তার পরিবারের অন্য সদস্যদের থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছিল। তাকে প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে রেমন্ডভিল শহরের একটি আটক কেন্দ্রে রাখা হয়, যা পরিবারের অবস্থানস্থল ডিলি কেন্দ্র থেকে প্রায় ২৩০ মাইল দূরে। তার বাবা, মা এবং দুই ছোট ভাইকে ডিলির পরিবারভিত্তিক আটক কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল।
পরিবারের এক আত্মীয় জানান, মুক্তির পর ওই তরুণ প্রথমে কংগ্রেস সদস্যের সঙ্গে একটি রেস্টুরেন্টে যান।
এই পরিবারের আটক হওয়ার খবর প্রকাশের পর বিভিন্ন মহলে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরিবারটির সদস্যদের মধ্যে মারিয়াচি সংগীতের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে এবং বাবা ও দুই ছেলে নিয়মিত সংগীত পরিবেশন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের পরিবারে মেক্সিকোতে বহু প্রজন্ম ধরে মারিয়াচি সংগীতচর্চার ইতিহাস রয়েছে।
তরুণটির ঘনিষ্ঠ এক পরিচিত ব্যক্তি জানান, পরিবারটি যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় প্রার্থনা করতে এসেছিল। পরিবারের প্রধানকে একসময় অপহরণ করা হয়েছিল এবং অপরাধী চক্রের কাছ থেকে হুমকির মুখে পড়তে হয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে তারা ২০২৩ সালের মে মাসে ব্রাউনসভিল সীমান্ত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে আশ্রয়ের আবেদন করেন। এরপর থেকে পরিবারটি সংগীত পরিবেশনার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিল।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের এক মুখপাত্র ইমেইলে জানান, তরুণটির বাবা-মাকে ২৫ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার করা হয় এবং তারা নিজেদের সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন। বিভাগটির দাবি, পরিবারটি ব্রাউনসভিল সীমান্তের কাছ দিয়ে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিল এবং আগের প্রশাসনের সময় তাদের দেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
বিভাগটি আরও জানায়, আইন অনুযায়ী বৈধ অনুমতি ছাড়া সীমান্তে উপস্থিত হওয়া ব্যক্তিদের দাবিগুলো বিচারাধীন থাকা পর্যন্ত তাদের আটক রাখার বিধান রয়েছে। তবে সংস্থাটি জানিয়েছে, শিশুদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সন্তানবিহীন পুরুষদের ডিলি কেন্দ্রের ভেতরে রাখা হয় না।
রিও গ্র্যান্ড ভ্যালি অঞ্চলে মারিয়াচি সংগীত অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং অনেক ক্ষেত্রে এটি প্রতিযোগিতামূলক কার্যক্রম হিসেবেও বিবেচিত হয়। এখানে মধ্য ও উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত রাজ্যব্যাপী প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় এবং অনেকেই পরবর্তীতে কলেজ পর্যায়ের সংগীত কর্মসূচিতে যুক্ত হয়।
এই তরুণ এবং তার ছোট ভাই এর আগেও তাদের সংগীত দলের সঙ্গে কংগ্রেসে আমন্ত্রিত হয়ে পরিবেশনা করেছিলেন। সেই ঘটনার উল্লেখ করে ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, কয়েক মাস আগেও তারা কংগ্রেসের সামনে সংগীত পরিবেশন করেছে, অথচ পরে তাদের আটক করা হয়েছে।
ঘটনাটি সামনে আসার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা ডিলি আটক কেন্দ্রে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং পরিবারটির মুক্তির জন্য চাপ সৃষ্টি করেন।
পরিবারের এক আত্মীয় জানান, তারা নিয়মিতভাবে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের প্রতিটি সাক্ষাতে হাজির হয়েছেন। আগে বলা হয়েছিল শিশুদের নিয়ে আসার প্রয়োজন নেই যাতে তারা স্কুলে যেতে পারে। কিন্তু সর্বশেষ সাক্ষাতের আগে ফোন করে জানানো হয়, এবার পরিবারের সবাইকে উপস্থিত থাকতে হবে।
এই নির্দেশনা শুনে পরিবারটি বিস্মিত হয়ে যায় বলে তিনি জানান।
টেক্সাসের এক রাজনৈতিক পরামর্শক এবং মারিয়াচি সংগীতশিল্পী বলেন, কাছের সংগীতশিল্পী মহলের কাছ থেকেই তিনি প্রথমে এই পরিবারের আটক হওয়ার খবর পান। এরপর বিষয়টি প্রচারে কাজ শুরু করেন। তার মতে, এটি এমন একটি পরিবারের ঘটনা যারা নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করছিল।
তিনি আরও বলেন, তরুণটি অত্যন্ত মেধাবী একজন সংগীতশিল্পী ও শিক্ষার্থী এবং তার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অপরাধমূলক অভিযোগ ছিল না।
গ্রেপ্তারের আগের রাতে ওই তরুণ ও তার ঘনিষ্ঠজন একটি গির্জার যুবসমাজের অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং পরদিনের অভিবাসন সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রার্থনা করেন।
ঘটনাটি দ্রুত রাজনৈতিক আলোচনায় রূপ নেয়। রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য এক বিবৃতিতে বলেন, পরিবারের গল্প তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে এবং তিনি বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে কথা বলে তাদের মুক্তির জন্য কাজ করেছেন।
তিনি আরও বলেন, কেউ কেউ যখন বিষয়টিকে রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ দিচ্ছিলেন, তখন তিনি সমাধান খুঁজতে কাজ করছিলেন।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট নেতারাও প্রশ্ন তোলেন, যারা আগে কংগ্রেসে সংগীত পরিবেশনের জন্য আমন্ত্রিত হয়েছিল, তাদের কেন আটক রাখা হলো।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অভিবাসন নীতি এবং আশ্রয়প্রার্থীদের আটক রাখার বিষয়টি আবারও জাতীয় আলোচনায় উঠে এসেছে।





Add comment