শীতকাল শেষ হওয়ার পর অনেকেই হঠাৎ করেই অকারণ ক্লান্তি, অবসাদ বা শক্তিহীনতার মতো সমস্যায় ভোগেন। কারও কারও ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঘুমের প্রবণতাও দেখা যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় ‘সিজনাল ফেটিগ’ বা ঋতু পরিবর্তনজনিত ক্লান্তি। সাধারণভাবে এক ঋতু থেকে অন্য ঋতুতে পরিবর্তনের সময় শরীরকে নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। এই অভিযোজন প্রক্রিয়ার সময় শরীরে কিছু সাময়িক পরিবর্তন ঘটে, যার ফলেই অনেকের মধ্যে ক্লান্তি বা অবসাদ অনুভূত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় শীতকালে দিনের আলো সবচেয়ে কম থাকে এবং তাপমাত্রাও তুলনামূলকভাবে কম থাকে। ফলে এই ঋতুর শেষে যখন আবহাওয়ার পরিবর্তন শুরু হয়, তখন শরীরকে একই সঙ্গে তাপমাত্রা, আলো এবং দৈনন্দিন অভ্যাসের পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। এই পরিবর্তনের সময়েই অনেকের শরীরে ক্লান্তির অনুভূতি বেশি দেখা দেয়।
প্রথমত, ঋতু পরিবর্তনের সময় শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ির ওপর প্রভাব পড়ে। শীতকালে দিনের আলো কম থাকার কারণে মানুষের দৈনন্দিন ঘুম ও জাগরণের ছন্দ এক ধরনের রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে যায়। কিন্তু বসন্তের দিকে অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দিনের আলো ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং দিন দীর্ঘ হয়। এই পরিবর্তনের সঙ্গে শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা ঘুম-জাগরণের জৈবিক ঘড়ি দ্রুত খাপ খাওয়াতে না পারলে ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে। এমনকি অনেক সময় দৈনন্দিন কাজেও মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, ঘুমের অভ্যাসেও পরিবর্তন আসে। সাধারণত শীতকালে মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি সময় ঘুমিয়ে থাকেন। দিনের আলো কম থাকার কারণে শরীরের ঘুমের চক্র কিছুটা বদলে যায় এবং অনেকেই বেশি ঘুমের অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু বসন্তের সময় সূর্য ওঠা ও ডোবার সময় ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে থাকে। তখন শরীরকে আবার নতুন সময়সূচির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। এই রূপান্তরের সময় শরীর আগের রুটিনে ফিরে আসতে কিছুটা সময় নেয়, যার ফলে ক্লান্তি বা অবসাদ অনুভূত হতে পারে।
তৃতীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি। শীতকালে সূর্যের আলো কম থাকায় অনেকের শরীরে ভিটামিন ডি-এর মাত্রা কমে যেতে পারে। এই ভিটামিন শরীরের শক্তি ও পেশির কার্যকারিতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ভিটামিন ডি কমে গেলে শরীরে ক্লান্তি, পেশির দুর্বলতা এবং কখনো কখনো মেজাজ খারাপ হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। ফলে শীত শেষে অনেকেই স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি অবসাদ অনুভব করেন।
এ ছাড়া শারীরিক সক্রিয়তার অভাবও একটি কারণ হতে পারে। শীতকালে অনেকেই ঠান্ডার কারণে বাইরে কম বের হন এবং শরীরচর্চাও কম করেন। ফলে শরীরের বিপাকক্রিয়া বা মেটাবলিজম কিছুটা ধীর হয়ে যেতে পারে। পরে আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যখন আবার স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা বা কাজকর্ম বাড়ে, তখন শরীরকে নতুন করে সক্রিয় হতে বাড়তি শক্তি ব্যয় করতে হয়। এই সময়টাতেই অনেকের ক্লান্তি বেশি অনুভূত হয়।
তবে এই ধরনের ক্লান্তি সাধারণত সাময়িক এবং জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনলে তা অনেকটাই কমানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, ঋতু পরিবর্তনের সময় সকালে কিছুটা সময় রোদে থাকা শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে। সকালের সূর্যালোক শরীরের জৈবিক ঘড়িকে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে। পাশাপাশি নিয়মিত হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম শরীরকে দ্রুত নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে।
ভোরে ঘুম থেকে উঠে ঝলমলে সকালের রোদে অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা হলে একদিকে শরীর প্রয়োজনীয় সূর্যালোক পায়, অন্যদিকে শরীরচর্চারও সুযোগ হয়। এতে শরীরের শক্তি বাড়ে এবং সারাদিনের ক্লান্তি মোকাবিলা করা তুলনামূলক সহজ হয়ে ওঠে।





Add comment