প্যারাসিটামল ব্যবহার: সতর্কতার সঙ্গে জীবন রক্ষা

দৈনন্দিন জীবনে জ্বর বা হালকা ব্যথা কমানোর জন্য প্যারাসিটামল অন্যতম জনপ্রিয় ওষুধ। সহজলভ্য এবং সাশ্রয়ী মূল্যের কারণে এটি অনেকের হাতের নাগালে থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি সাধারণত নিরাপদ ওষুধ হিসেবে বিবেচিত এবং ‘ওভার দ্য কাউন্টার’ অর্থাৎ চিকিৎসকের প্রাপত্র ছাড়া কেনা যায় এমন ওষুধ হিসেবে স্বীকৃত। তবে প্যারাসিটামলের অতিরিক্ত বা ভুল ব্যবহার মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

প্রচলিত ভুল ধারণা

প্যারাসিটামল নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো, ‘এটি যত খুশি খাওয়া যায়, কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই’। আসলে যেকোনো ওষুধের মতো এর নির্দিষ্ট মাত্রা রয়েছে। অনেকে মনে করেন, বেশি মাত্রায় বা ঘন ঘন ওষুধ খেলে জ্বর দ্রুত কমবে। এটি সম্পূর্ণ ভুল। অত্যধিক প্যারাসিটামল লিভারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং স্থায়ীভাবে লিভারের ক্ষতি ঘটাতে পারে।

আরেকটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, খালি পেটে প্যারাসিটামল খাওয়া যাবে না। সত্য হলো, খালি পেটে খাওয়া সম্ভব এবং এর কার্যকারিতায় কোনো পরিবর্তন আসে না। তবে যাদের দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস্ট্রিক বা আলসারের সমস্যা আছে, তারা পেটে কিছু খেয়ে ওষুধ নিলে নিরাপদ থাকে।

‘প্যারাসিটামল খেলে সঙ্গে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেতে হয়’—এও ভুল ধারণা। প্যারাসিটামল সাধারণত গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটি তৈরি করে না, যা কিছু ব্যথানাশক ওষুধ করতে পারে।

প্যারাসিটামলের সঙ্গে কোন ওষুধ বিপজ্জনক

১. রক্ত পাতলা করার ওষুধ
যারা নিয়মিত ব্লাড থিনার ব্যবহার করেন, তারা দীর্ঘমেয়াদি উচ্চমাত্রায় প্যারাসিটামল খেলে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারেন। এটি ওষুধের কার্যকারিতায়ও প্রভাব ফেলে।

২. অন্যান্য প্যারাসিটামলযুক্ত ওষুধ
সর্দি-কাশি বা ব্যথার জন্য একাধিক ওষুধ নেওয়ার সময় অজান্তে প্যারাসিটামলের অতিরিক্ত মাত্রা শরীরে পৌঁছতে পারে, যা ‘হিডেন ওভারডোজ’ হিসেবে পরিচিত।

৩. মৃগীরোগ বা খিঁচুনির ওষুধ
কিছু মৃগীরোগের ওষুধ যেমন কার্বামাজেপিন, ফেনাইটোইন, ফেনোবারবিটল লিভারের এনজাইম বৃদ্ধি করে। এর ফলে প্যারাসিটামল বিষাক্ত উপাদান তৈরি করতে পারে, যা লিভারের কোষ ধ্বংস করে।

৪. যক্ষ্মার কিছু ওষুধ
যক্ষ্মার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু ওষুধ, যেমন আইসোনিয়াজিড, প্যারাসিটামলের সঙ্গে বিক্রিয়া করে লিভারের ক্ষতি করতে পারে। যক্ষ্মার চিকিৎসা চলাকালীন যে কোনো ব্যথানাশক খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৫. অ্যালকোহল
অ্যালকোহলের সঙ্গে প্যারাসিটামলের মিলিত ব্যবহার সবচেয়ে বিপজ্জনক। নিয়মিত অ্যালকোহল পানকারী ব্যক্তি প্যারাসিটামল নিলে লিভারের সমস্যা বহুগুণ বেড়ে যায়। কারণ উভয়ই লিভারে বিপাকের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত হয়, যা অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

সঠিক ব্যবহার ও প্রতিকার

১. মাত্রাজ্ঞান
একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টায় ৪ থেকে ৬ গ্রাম প্যারাসিটামল নিতে পারেন। তবে দুই দিনের বেশি জ্বর থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।

২. শিশুদের ক্ষেত্রে সতর্কতা
শিশুদের জন্য ওজন অনুযায়ী ডোজ নির্ধারণ করা হয়। অনুমান করে বড়দের বড়ি ভাঙে শিশুদের খাওয়ানো বিপজ্জনক।

৩. জ্বর মাপা ও প্রাকৃতিক প্রতিকার
শরীরের তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের নিচে থাকলে ওষুধ না খেয়ে জলপট্টি, হালকা ঠান্ডা পানিতে গামছা ভিজিয়ে শরীর মুছে দেওয়া এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়াই শ্রেয়। এতে শরীরের প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ব্যবহার করা সম্ভব হয়।

শেষ কথা

প্যারাসিটামল জীবনদায়ী হতে পারে যদি তা সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়। মাথাব্যথা বা সামান্য গা ব্যথার জন্য হুটহাট ওষুধ না খেয়ে পর্যাপ্ত পানি পান এবং বিশ্রাম নিন। সচেতন ব্যবহারই সুস্থ থাকার মূল চাবিকাঠি।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed