নেপালের সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনে প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোকে পেছনে ফেলে নতুন শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি)। প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, দলটির নেতা বালেন্দ্র শাহ বিপুল সমর্থন নিয়ে দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে এগিয়ে আছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, তরুণ প্রজন্মের সমর্থন এবং ভিন্নধর্মী নির্বাচনী কৌশল এই বিজয়ের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
এই নির্বাচনের ফলাফল শুধু নেপালের রাজনীতিতেই নতুন সমীকরণ তৈরি করেনি, বরং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতাও নতুনভাবে আলোচনায় এনেছে। বিশেষ করে জেন-জি প্রজন্মের রাজনৈতিক প্রভাব এখানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একই প্রজন্মের নেতৃত্বে ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল আওয়ামী লীগ। তার এক বছর এক মাস পর একই ধরনের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে নেপালের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতা হারান।
এরপর গত মাসে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণেরা নতুন দল গঠন করে নির্বাচনে অংশ নিলেও বড় ধরনের সাফল্য পায়নি। তবে নেপালে পরিস্থিতি হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে তরুণ ভোটারদের বড় অংশ তাদের পছন্দের প্রার্থী বালেন্দ্র শাহকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচনে জয়ী করেছেন।
গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায়, নেপালের সাধারণ ভোটাররা দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। র্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা বালেন্দ্র শাহর নেতৃত্বে আরএসপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পার্লামেন্টে বসতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট পদ্ধতিতে ১৬৫টি আসন এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে ১১০টি আসনের চূড়ান্ত ফলাফল আগামী সপ্তাহের মধ্যে ঘোষণা করা হবে।
৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহকে ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসার এই প্রচারণার সূচনা হয়েছিল পশ্চিম কাঠমান্ডুর একটি ছয়তলা ভবন থেকে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলেছেন দলটির ছয়জন নেতা। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রচারণার বড় অংশ পরিচালিত হয়েছে বালাজু এলাকার দলীয় সদর দপ্তরের ওপরের তিনটি তলা থেকে। আর নির্বাচনী প্রচারের বড় অংশের অর্থ এসেছে প্রবাসী নেপালিদের অনুদান থেকে।
দলটির জাতীয় প্রচারণা দলের সদস্য বিজ্ঞান গৌতম বলেন, মাঠপর্যায়ে মানুষের কাছ থেকে পাওয়া সমর্থন ও ভালোবাসা তাঁদের অভিভূত করেছে।
আরএসপির নির্বাচনী কৌশলের কেন্দ্রে ছিল দলটির রিসার্চ, স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড ডকুমেন্টেশন বিভাগ। ১১ সদস্যের একটি বোর্ডের তত্ত্বাবধানে প্রায় ৩০০ কর্মী তিনটি দলে ভাগ হয়ে এই কাজ পরিচালনা করেন। তাঁদের দায়িত্বের মধ্যে ছিল নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ, জনসভা আয়োজন, অনলাইন কনটেন্ট তৈরি ও ব্যবস্থাপনা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রচারণা ও জনমতের তথ্য সংগ্রহ করা।
দলটি গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনাতেও একটি পরিকল্পিত কৌশল অনুসরণ করে। বালেন্দ্র শাহ প্রতি আট দিনে একটি বড় জনসভায় ভাষণ দিতেন। সেই ভাষণের বার্তা দলটির ৬৬০ সদস্যের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিমের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হতো।
এর পাশাপাশি প্রতিদিন পাঁচ থেকে সাতটি জেলায় রোড শো অনুষ্ঠিত হয়। একই দিনে সাতটি প্রদেশের যেকোনো একটিতে গিয়ে সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে দেখা করতেন শাহ।
দলটির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অতিরিক্ত ভাষণ দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার বদলে তাঁরা কৌশলগতভাবে বিরোধী দলগুলোর বক্তব্যের অপেক্ষা করতেন। এরপর একবারেই জবাব দিয়ে নিজেদের বার্তাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতেন।
এই কেন্দ্রীয় প্রচার কর্মসূচি ও বড় সমাবেশের ব্যয় দলীয় তহবিল থেকেই বহন করা হয়। নেতারা জানান, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা প্রবাসী নেপালিদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অনুদান পাওয়া গেছে। তবে প্রতিটি প্রার্থীকে নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার প্রচার কর্মসূচি আয়োজন এবং অর্থায়নের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন দলটির কোষাধ্যক্ষ লিমা অধিকারী।
গত ডিসেম্বরে আরএসপিতে যোগ দেওয়ার আগে বালেন্দ্র শাহ ছিলেন রাজধানী কাঠমান্ডুর মেয়র। ২০২২ সালে তিনি এই পদে নির্বাচিত হন। জনপ্রিয় র্যাপ তারকা হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বিপুল অনুসারী ছিল, যা নির্বাচনী প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গত ১৯ জানুয়ারি মাধেশ প্রদেশের রাজধানীতে এক জনসভায় আরএসপির প্রতিষ্ঠাতা ও টেলিভিশন উপস্থাপক থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া দলের আরেক নেতার সঙ্গে মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, একজন মাধেশি ছেলে প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছে। এই বক্তব্য দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।
মাধেশ এবং আশপাশের তেরাই সমতল অঞ্চল নেপালের সবচেয়ে জনবহুল এলাকা হলেও দীর্ঘদিন ধরে দেশটির রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে কাঠমান্ডু ও পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি এলাকার রাজনৈতিক অভিজাতরা। ফলে শাহর বক্তব্য নতুন রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা দেয়।
আরএসপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বীরেন্দ্র কুমার মেহতা বলেন, দেশের মানুষ পুরোনো দুর্নীতিগ্রস্ত নেতৃত্বে বিরক্ত হয়ে পড়েছে। তারা তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে নতুন আশার প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছে।
বালেন্দ্র শাহ নিজে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন ঝাপা-৫ আসনে, যা দীর্ঘদিন ধরে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। গত সেপ্টেম্বরে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা ছাড়ার আগে তিনি একাধিকবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
এই গ্রামীণ এলাকায় শাহ তাঁর প্রচারণায় প্রচলিত রাজনৈতিক রীতি থেকে ভিন্ন পথ অনুসরণ করেন। সংবাদমাধ্যমের স্টুডিওতে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেওয়ার পরিবর্তে তিনি পথে পথে থেমে সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলাকে গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়।
কাঠমান্ডুতে দলটির প্রচারণা টিম ভোটারদের মতামত ও অভিযোগ সংগ্রহ করেছে, বিশেষ করে উন্নয়ন প্রকল্প ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে।
আরএসপির ভাইস চেয়ারম্যান ডি পি আরিয়াল বলেন, দেশের প্রতিটি অঞ্চলের মানুষ যেন অনুভব করতে পারে যে সরকার তাদেরই এবং সরকার তাদের জন্যই কাজ করছে।
সম্ভাব্য নতুন সরকার প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে বাইরের বিশেষজ্ঞদেরও যুক্ত করতে চায় বলে জানান তিনি। পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ এবং প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।





Add comment