তিন বছর ধরে অভিবাসন হেফাজতে থাকার পর অবশেষে আদালতের রায়ে নিজের নাগরিকত্ব ফিরে পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী এক ব্যক্তি। দীর্ঘ এই সময়ের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি জানিয়েছেন, এই ঘটনা তার জীবনকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দিয়েছে এবং তিনি প্রায় সবকিছুই হারিয়েছেন। এখন নতুন করে জীবন শুরু করার প্রত্যাশা করছেন তিনি।
ভার্জিনিয়ার আলেকজান্দ্রিয়া শহরের বাসা থেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওই ব্যক্তি জানান, তিন বছর ধরে আটক থাকার স্মৃতি এখনো তাকে তাড়া করে বেড়ায়। প্রায়ই দুঃস্বপ্নে সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। তার ভাষায়, এই অভিজ্ঞতা এমন একটি কষ্টের সময়, যা তিনি কোনো মানুষের জীবনে কামনা করেন না।
প্রায় এক দশক আগে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ দাবি তোলে যে, তিনি কিশোর বয়সে মায়ের মাধ্যমে যে নাগরিকত্ব পেয়েছিলেন তা বৈধ নয়। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে দেশ থেকে বহিষ্কারের প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। কারণ তার তরুণ বয়সে একটি মাদক সংক্রান্ত মামলায় দণ্ডিত হওয়ার ইতিহাস ছিল।
তবে শুরু থেকেই তিনি দাবি করে আসছিলেন যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। অভিবাসন কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ, আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা, আদালতে শুনানি এবং গণমাধ্যমের প্রশ্নের মুখেও তিনি একই কথা বলে গেছেন।
তিনি জানান, ছোটবেলায় তিনি এল সালভাদর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে আসেন। তখন তার বয়স ছিল ১১ বছর। পরে তার মা নাগরিকত্ব লাভ করলে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পান। তার মতে, সে সময়কার আইন অনুযায়ী সেটিই ছিল স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, “ডেরিভেটিভ সিটিজেনশিপ” বলতে বোঝায় এমন পরিস্থিতি যেখানে ১৮ বছরের নিচের কোনো সন্তান তার বাবা বা মায়ের নাগরিকত্বের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পায়। নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে বিদেশে জন্ম নেওয়া দত্তক সন্তানদের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে অভিবাসন কর্মকর্তারা তাকে আটক করেন এবং ভার্জিনিয়ার বোলিং গ্রিন এলাকায় অবস্থিত একটি আটক কেন্দ্রে রাখা হয়। চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি সেখানে ছিলেন। পরে একটি ফেডারেল আপিল আদালতের রায়ের মাধ্যমে তার মুক্তি নিশ্চিত হয়। ওই রায়ে শুধু তার বহিষ্কার প্রক্রিয়াই বন্ধ করা হয়নি, বরং তাকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবেও পুনরায় স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
তার আইনজীবী জানান, আদালত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে তিনি ১৯৯৮ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। এই কারণেই আদালতের নির্দেশে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
এই বিষয়ে অভিবাসন ও সীমান্ত নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে মন্তব্য চাওয়া হলেও তারা কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
ঘটনার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ আইনি লড়াই। যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর তার মা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পন্ন করে তাকে আইনগতভাবে নিয়ে আসেন। পরে মা নাগরিকত্ব পাওয়ার পর সে সময়কার আইন অনুযায়ী তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব অর্জন করেন।
তবে ২০ বছর বয়সে তিনি মাদক সংক্রান্ত অপরাধে দণ্ডিত হন এবং প্রায় সাত বছর কারাভোগ করেন। কারাগারে থাকা অবস্থায় সরকারি কর্মকর্তারা তার সঙ্গে দেখা করেন এবং সে সময় তারা স্বীকারও করেন যে তিনি মায়ের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পেয়েছেন।
২০১১ সালে কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর তিনি নতুনভাবে জীবন শুরু করেন। উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন, বৈদ্যুতিক কাজ শেখেন এবং নিজস্ব ব্যবসা শুরু করেন। এক দশকের বেশি সময় তিনি নিয়মিত কাজ করেছেন, পরিবার গড়েছেন এবং সন্তানদের লালনপালন করেছেন।
কিন্তু ২০১৬ সালে কর্তৃপক্ষ তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে। তারা তাকে নাগরিক নয়, বরং কেবল স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে বিবেচনা করে এবং আগের অপরাধের কারণে তাকে দেশ থেকে বহিষ্কারের প্রক্রিয়া শুরু করে।
এরপর কয়েক বছর ধরে তিনি ও তার আইনজীবীরা আদালতে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে তিনি আইন অনুযায়ী মায়ের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পেয়েছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, এল সালভাদরের সংবিধানে জন্মসূত্রের সন্তানদের মধ্যে পার্থক্য তুলে দেওয়া হয়েছিল। ফলে কেবল মায়ের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়টি যথেষ্ট নয় বলে তারা দাবি করে।
তবে আপিল আদালতের বিচারকরা বিষয়টি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করেন। তারা এল সালভাদরের আইন, পারিবারিক ইতিহাস এবং পিতৃত্ব সম্পর্কিত বিষয় বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে তার জৈবিক বাবা কখনো আইনি অর্থে পিতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেননি।
ফলে আদালত মনে করে, তার মা-ই ছিলেন তার একমাত্র আইনি অভিভাবক। তাই মায়ের নাগরিকত্বের মাধ্যমে তার নাগরিকত্ব অর্জন পুরোপুরি বৈধ।
রায়ের পর তার আইনজীবী জানিয়েছেন, তারা সরকারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কারণ তাদের মতে, একজন নাগরিককে কখনোই অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হেফাজতে আটক রাখা উচিত নয়।
তিন বছরের বন্দিজীবনের কারণে ওই ব্যক্তি তার বৈদ্যুতিক কাজের ব্যবসা হারিয়েছেন। চাকরি ও আয়ের উৎসও বন্ধ হয়ে গেছে। তার ভাষায়, এই ঘটনার কারণে তার পরিবারকেও কঠিন মানসিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
বর্তমানে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। ভবিষ্যতে আবার কোনো জিজ্ঞাসাবাদ বা গ্রেপ্তারের আশঙ্কা থেকে তিনি আদালতের রায়ের একটি কপি সব সময় সঙ্গে রাখেন।
তার লক্ষ্য আবার নিজের বৈদ্যুতিক ব্যবসা গড়ে তোলা এবং আগের পরিচিত ঠিকাদারদের সঙ্গে কাজ শুরু করা। তিনি বলেন, হারিয়ে যাওয়া সময় আর কখনো ফিরে পাওয়া যাবে না। তাই এখন তাকে নতুন করে শুরু করতে হবে।
আটক অবস্থায় দীর্ঘ রাতগুলোতে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে গান লেখা শুরু করেছিলেন। সেই গানগুলোতে তিনি তার আইনি লড়াই, আটক কেন্দ্রের অভিজ্ঞতা এবং পরিবারের প্রতি ভালোবাসার কথা তুলে ধরেছেন। তার মতে, পরিবারের ভালোবাসাই তাকে এই দীর্ঘ সংগ্রামে টিকে থাকতে শক্তি দিয়েছে।





Add comment