চাকরি কমছে, খরচও কমছে অর্থনীতিতে নতুন সংকেত

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে এতদিন ধরে টিকিয়ে রাখা প্রধান ভিত্তিগুলোর একটি ছিল ভোক্তাদের ব্যয়। তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচক বলছে, সেই শক্ত ভিত এখন ধীরে ধীরে চাপের মুখে পড়ছে। চাকরির সংখ্যা কমে যাওয়া, শেয়ারবাজারে অস্থিরতা এবং ব্যয়ের প্রবণতা হ্রাস পাওয়ায় অর্থনীতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বিশ্লেষকদের মধ্যে।

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে ছিল। কর্মসংস্থানের সুযোগ বজায় থাকায় নাগরিকেরা ব্যয় কমাননি, যদিও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন সময় অনিশ্চয়তা দেখা গেছে। ভোক্তাদের ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের মোট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জোগান দেয়। একই সঙ্গে শক্তিশালী শেয়ারবাজার বিশেষ করে ধনী পরিবারের ব্যয় বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, কারণ এই শ্রেণির মানুষের বড় অংশেরই আর্থিক বিনিয়োগ রয়েছে।

কিন্তু সেই দৃঢ় ভিত্তি এখন কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে দেশটিতে ৯২ হাজার চাকরি কমেছে। একই সময়ে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এটি সাম্প্রতিক সময়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ধীরগতির ধারাবাহিকতা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

এদিকে শেয়ারবাজারেও দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। তিনটি প্রধান শেয়ার সূচক সকালের লেনদেনেই নিম্নমুখী ছিল। এর পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা এবং সেই সংঘাত নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কঠোর অবস্থান বড় ভূমিকা রাখছে বলে বাজার বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

শুধু কর্মসংস্থান নয়, ব্যয়ের ক্ষেত্রেও ইতিমধ্যে দুর্বলতার ইঙ্গিত মিলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে খুচরা বিক্রি আগের মাসের তুলনায় ০ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। গত বছরের মে মাসের পর এটিই সবচেয়ে বড় পতন। অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস ছিল বিক্রি স্থিতিশীল থাকবে, কিন্তু বাস্তব চিত্র সেই প্রত্যাশার নিচে নেমে গেছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, যদি শেয়ারবাজারের পতন ও বেকারত্ব বৃদ্ধির প্রভাব একসঙ্গে ভোক্তা ব্যয়ের ওপর পড়ে, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিনিয়োগকারী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারকেরাও বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। কারণ প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি ভবিষ্যতে শ্রমবাজারে কী ধরনের পরিবর্তন আনবে তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

সম্প্রতি একটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাদের প্রায় অর্ধেক কর্মী ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এতে প্রযুক্তি খাতের বাইরে অন্য খাতেও একই ধরনের পরিবর্তনের আশঙ্কা বাড়ছে।

তবে কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করেন, স্বল্পমেয়াদে ব্যয়ের প্রবণতা কিছুটা বাড়তে পারে। তাদের মতে, চলতি বছরে ফেডারেল কর ফেরত পাওয়ার পরিমাণ গত বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি হতে পারে, যা অন্তত বছরের প্রথমার্ধে ক্রয়ক্ষমতা কিছুটা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।

গত বছরও অর্থনীতি নিয়ে হতাশা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা ব্যয় কমাননি। শুল্ক বৃদ্ধি এবং ধীরগতির কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মধ্যেও ভোক্তারা বাজারে সক্রিয় ছিলেন। যদিও বেকারত্বের হার এখনও তুলনামূলকভাবে কম এবং বেকার ভাতার নতুন আবেদন খুব বেশি বাড়েনি, তবুও শ্রমবাজার ২০২৬ সালে স্থিতিশীল থাকবে নাকি আরও দুর্বল হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

জরিপগুলোতে দেখা গেছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক নাগরিকই অসন্তুষ্ট। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষদের মধ্যে এই চাপ বেশি অনুভূত হচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, তাদের মজুরি বৃদ্ধি উচ্চ আয়ের মানুষের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে নিম্ন ও মধ্য আয়ের অনেক মানুষ দৈনন্দিন খরচ সামাল দিতে ক্রেডিট কার্ড ও ঋণের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।

অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এ পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতিফলন, যাকে অনেকেই ‘কে-আকৃতির অর্থনীতি’ বলে থাকেন। অর্থাৎ সমাজের এক অংশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, আর অন্য অংশ তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়ছে।

ধনী জনগোষ্ঠীর ব্যয়ের পেছনে এতদিন শেয়ারবাজারের শক্তিশালী অবস্থান বড় সহায়ক ছিল। এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে দেশের মোট ভোক্তা ব্যয়ের প্রায় অর্ধেকই এসেছে শীর্ষ ১০ শতাংশ আয়কারী মানুষের কাছ থেকে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারের ওপর চাপ বাড়ায় সেই ব্যয়ও কমে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এবং শেয়ারবাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে তার প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed