যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম অভিবাসী আটককেন্দ্র হিসেবে পরিচিত টেক্সাসের এল পাসোর ফোর্ট ব্লিসে স্থাপিত ক্যাম্প ইস্ট মন্টানার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে মূল্যায়ন শুরু করেছে দেশটির হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ। কেন্দ্রটি চালু হওয়ার মাত্র সাত মাস পরই এর কার্যক্রম, ব্যবস্থাপনা এবং চুক্তি নিয়ে পুনর্বিবেচনা চলছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের এক মুখপাত্র জানান, বর্তমানে কেন্দ্রটির অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তি নিয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে চুক্তি নবায়ন, বাতিল কিংবা নতুন করে প্রদান করা হবে কি না সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
এল পাসোর বাইরে অবস্থিত ফোর্ট ব্লিস সামরিক ঘাঁটির পাশে নির্মিত এই বিশাল তাঁবুভিত্তিক আটককেন্দ্রটি শুরু থেকেই নানা সমস্যার কারণে আলোচনায় এসেছে। নির্মাণকাজ চলাকালীন এক শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে এবং কেন্দ্রটি চালুর পর মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যে তিনজন আটক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একটি মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রটিতে যক্ষ্মা ও হাম রোগের সংক্রমণও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটেছে।
মুখপাত্র জানান, অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা তাদের হেফাজতে থাকা অবৈধ অভিবাসীদের জন্য সর্বোচ্চ মানের সেবা নিশ্চিত করতে সব সময়ই আটককেন্দ্রগুলোর উন্নয়নের উপায় খুঁজে থাকে। তিনি আরও বলেন, এই কেন্দ্রটির চুক্তি মূলত প্রতিরক্ষা বিভাগের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। তাই হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ নিয়মিত নিরীক্ষা ও পরিদর্শনের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছে যে কেন্দ্রটি তাদের নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করছে কি না।
ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের তথ্য অনুযায়ী ক্যাম্প ইস্ট মন্টানায় প্রায় তিন হাজার অভিবাসী আটক রয়েছেন। অভিবাসন কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৮২ শতাংশের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অপরাধমূলক রেকর্ড নেই।
সম্প্রতি এই আটককেন্দ্রে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে হাম রোগের সংক্রমণ। গত মঙ্গলবার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করে যে কেন্দ্রটিতে আটক থাকা অন্তত ১৪ জনের শরীরে হাম রোগ শনাক্ত হয়েছে। অত্যন্ত সংক্রামক এই রোগের বিস্তার ঠেকাতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অন্যদের থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এ ঘটনায় আরও শতাধিক ব্যক্তিকে পৃথকভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের একজন কংগ্রেস সদস্য, যার নির্বাচনী এলাকা এল পাসো জেলা অন্তর্ভুক্ত। তিনি আরও বলেন, রোগ সংক্রমণের কারণে বর্তমানে ক্যাম্প ইস্ট মন্টানা আইনজীবী ও দর্শনার্থীদের জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
এই আটককেন্দ্রটি নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে ভার্জিনিয়ার রিচমন্ডভিত্তিক একটি ছোট সরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। গত জুলাইয়ে প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এই দায়িত্ব পায়। এর আগে ফেডারেল সরকারের সঙ্গে তাদের সবচেয়ে বড় চুক্তির পরিমাণ ছিল মাত্র ১৬ মিলিয়ন ডলার।
প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট এখনও সীমিত তথ্যসমৃদ্ধ এবং সেখানে “সাইট রক্ষণাবেক্ষণ চলছে” এমন একটি বার্তা প্রদর্শিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী একজন ৭৭ বছর বয়সী ব্যক্তি, যিনি নিজের ব্যক্তিগত বাসা থেকেই ব্যবসা পরিচালনা করেন বলে জানা গেছে। তার সঙ্গে যোগাযোগের একাধিক চেষ্টা আগেও সফল হয়নি।
এদিকে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা দেশজুড়ে তাদের আটককেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়ানোর বৃহৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলারের এই সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বড় বড় গুদামঘর ক্রয় করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশজুড়ে গ্রেপ্তার ও আটক ব্যক্তির সংখ্যা বর্তমান ৭০ হাজার থেকে বাড়িয়ে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর অংশ হিসেবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে এল পাসোর কাছাকাছি একটি গুদামঘর ১২০ মিলিয়ন ডলারের বেশি দামে কিনেছে সংস্থাটি, যা ক্যাম্প ইস্ট মন্টানার খুব কাছেই অবস্থিত।
তবে পরিকল্পনাটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট খাতের কিছু ঠিকাদার সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, একটি কেন্দ্রে আট হাজারের বেশি ব্যক্তিকে আটকে রাখার পরিকল্পনা ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের অভিমত, কোনো আটককেন্দ্রে দেড় হাজারের বেশি মানুষ রাখাই নিরাপদ নয়।
টেক্সাস সিভিল রাইটস প্রজেক্টের এক মানবাধিকার আইনজীবী প্রায় প্রতি সপ্তাহেই কেন্দ্রটি পরিদর্শনে যান এবং সেখানে খাদ্যের ঘাটতি, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও অপর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবার অভিযোগ তুলেছেন। হাম রোগের প্রাদুর্ভাবের কারণে কেন্দ্রটি মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ থাকবে বলেও তিনি জানান।
মানবাধিকার সংগঠনটির এই আইনজীবী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, শুরু থেকেই এই কেন্দ্রটি বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছেন তারা এবং সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই দাবিকে আরও জোরালো করেছে।
এদিকে একটি প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ ক্যাম্প ইস্ট মন্টানা স্থায়ীভাবে বন্ধ করার সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে।





Add comment