বাড়ছে জলবায়ু অন্যায়: চরম আবহাওয়ার দাপটে বিপর্যস্ত বিশ্ব

বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান চরম আবহাওয়া এখন এক ভয়াবহ বাস্তবতা। প্রতিদিনের মতো এখন প্রায় নিয়মিতই দেখা যাচ্ছে ঘূর্ণিঝড়, টাইফুন, অতিবৃষ্টি বা তীব্র খরার মতো দুর্যোগ। সবচেয়ে করুণ দিক হলো—এই প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো এখন এমন সব দেশে ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে, যারা বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম দায়ী।

সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত হয়েছে ক্যারিবীয় অঞ্চল, বিশেষ করে জ্যামাইকা। একই সময়ে ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামে টাইফুন ‘কালমেগি’ প্রায় ২০০ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। এই ঘটনাগুলো আরও একবার প্রমাণ করছে যে জলবায়ু সংকট কেবল ভবিষ্যতের হুমকি নয়, বরং বর্তমানেই তার প্রভাব ভয়াবহভাবে দৃশ্যমান।

প্রাথমিক জলবায়ু গবেষণায় জানা গেছে, গত সপ্তাহে জ্যামাইকায় টানা পাঁচ দিনের যে বৃষ্টি হয়েছে, তা বর্তমান বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে অন্তত দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এই বৃষ্টিতে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এখন পর্যন্ত ক্যারিবীয় অঞ্চলে অন্তত ৭৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। অর্থনৈতিকভাবে এই ক্ষতির পরিমাণ এতটাই বেশি যে, জ্যামাইকার মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এমন বিপর্যয় আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনার ক্ষেত্রেও বড় প্রভাব ফেলছে। বৈশ্বিক জলবায়ু প্রক্রিয়ায় স্বীকৃত যে, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোই আসলে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী। কারণ, তাদের কার্বন নিঃসরণ তুলনামূলকভাবে খুবই কম। কিন্তু এই বাস্তবতা স্বীকার করা সত্ত্বেও, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য তৈরি “লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড” বা ক্ষয়ক্ষতি তহবিলে কার্যকর সহায়তা এখনো সীমিত।

ব্রাজিলে শুরু হতে যাওয়া জলবায়ু সম্মেলনে এ নিয়ে আলোচনা হলেও, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এই পর্যায়ে সম্ভব হবে না। জলবায়ু তহবিলের ঘাটতি এখন যেমন উদ্বেগের বিষয়, তেমনি দেশগুলোর পর্যাপ্ত নিঃসরণ হ্রাসের প্রতিশ্রুতিও এখনো অনেক দুর্বল।

ক্যারিবীয় অঞ্চলের অনেক দেশ এখনো বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন, খাদ্য সংকটে ভুগছে এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। ভবন ধস, ভূমিধস ও বন্যা পরিস্থিতি মানুষের জীবনযাত্রাকে একেবারে থমকে দিয়েছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ধনী দেশগুলোর সহায়তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবতায় পরিণত না হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো আরও বিপাকে পড়ছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে ঘোষিত সীমিত মানবিক সহায়তা—যা মাত্র কয়েক মিলিয়ন পাউন্ড—পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়।

ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো দীর্ঘদিন ধরেই জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধভাবে আওয়াজ তুলছে। তারা আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করেও কিছু নীতিগত স্বীকৃতি পেয়েছে। আদালতের পরামর্শমূলক মতামতে বলা হয়েছে, জলবায়ু চুক্তিগুলো কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং “আইনগত বাধ্যবাধকতা”ও তৈরি করে। তবে বাস্তবে এই সিদ্ধান্তগুলোর প্রয়োগ এখনো অস্পষ্ট।

বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি আরও একটি নৈতিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। নির্ধারিত ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমার মধ্যে তাপমাত্রা ধরে রাখতে বিশ্ব ব্যর্থ হয়েছে পরপর দুই বছর। এটি কেবল পরিবেশগত নয়, নৈতিক ব্যর্থতাও বটে।

জলবায়ু সংকটের মুখে এখন প্রয়োজন কেবল সবুজ জ্বালানিতে রূপান্তর নয়, বরং সংকটে পড়া দেশগুলোর পাশে দাঁড়ানো। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ভয়াবহ প্রভাব একক কোনো দেশের সমস্যা নয়—এটি মানবজাতির অভিন্ন দায়। আর এই দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed