পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিভিন্ন উপাদানের গতিপ্রকৃতির ওপর নির্ভর করে গ্রহটির সামগ্রিক ভারসাম্য বজায় থাকে। তবে পানি, বরফ ও বায়ুর ওজনের তারতম্যের কারণে পৃথিবীর ভরকেন্দ্র ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির একদল গবেষক। তাঁদের মতে, এই ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন আধুনিক স্যাটেলাইট পজিশনিং ও নেভিগেশন ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, পৃথিবীর ভরকেন্দ্র ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্রমাগত স্থান পরিবর্তন করছে। পানি, বরফ ও বাতাসের ওজনের চাপে গ্রহের অভ্যন্তরে প্রতিনিয়ত এই পরিবর্তন ঘটে চলেছে, যার ফলে পৃথিবীর ভরকেন্দ্র নিজস্ব জ্যামিতিক কেন্দ্র থেকে প্রায় কয়েক মিলিমিটার পর্যন্ত সরে যায়। এই সামান্য পরিবর্তনও আধুনিক বিশ্বের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ম্যাপিং ও নেভিগেশন ব্যবস্থায় লক্ষণীয় ত্রুটি তৈরি করতে পারে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।
স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পৃথিবীর ভরকেন্দ্রের এই পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেছেন গবেষকেরা। তাঁদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে পানির পরিমাণের তারতম্যই মূলত এই ভরকেন্দ্র পরিবর্তনের প্রধান কারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, মার্চ মাসে উত্তর আমেরিকা ও ইউরেশিয়া অঞ্চলে তুষার জমে যাওয়ার ফলে ভরকেন্দ্র উত্তর মেরুর দিকে প্রায় তিন মিলিমিটার সরে যায়। অন্যদিকে এপ্রিল মাসে আমাজন নদী অববাহিকায় বৃষ্টির পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ভরকেন্দ্র দক্ষিণ আমেরিকার দিকে প্রায় আড়াই মিলিমিটার পর্যন্ত ঝুঁকে পড়ে।
গবেষক দলের একজন সদস্য জানান, পৃথিবীর ভরকেন্দ্রের পাশাপাশি গ্রহের উত্তর মেরুও ক্রমাগত নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে চলেছে। হিমবাহ ও বরফ গলে যাওয়ার প্রক্রিয়াই মূলত এই মেরু পরিবর্তনের পেছনে দায়ী, আর একুশ শতকের শেষ নাগাদ এই পরিবর্তনের মাত্রা আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁর মতে, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে এই পরিবর্তনের গতি আরও দ্রুততর হয়ে উঠতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর ভরকেন্দ্র ও মেরু অবস্থানের এই ধরনের পরিবর্তন শুধু বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের বিষয় নয়, বরং এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে জিপিএসের মতো দৈনন্দিন প্রযুক্তির নির্ভুলতার ওপরও। নেভিগেশন, ম্যাপিং কিংবা জলবায়ু গবেষণার মতো ক্ষেত্রে যেসব তথ্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম নির্ভুলতার ওপর নির্ভরশীল, সেসব ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে এই পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা। এ কারণে পৃথিবীর ভরকেন্দ্র ও মেরু অবস্থানের এই পরিবর্তন নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন তাঁরা।





Add comment