ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাজপথে নেমেছেন তরুণেরা। ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি ও আলবেনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ। কোথাও শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা ও শিক্ষকের সংকট, কোথাও বাড়িভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবার কোথাও দুর্নীতি ও কর্মসংস্থানের অভাব নিয়ে ক্ষোভ জানাচ্ছেন বিক্ষোভকারীরা। ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে সরকার বিরোধী বৃহত্তর বিক্ষোভে রূপ নিয়েছে। কয়েকটি দেশে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সহিংসতায়ও গড়িয়েছে।
ফ্রান্সে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর এক সপ্তাহ পর শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। দীর্ঘ ক্লাসের সময়, শিক্ষকের ঘাটতি, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অস্পষ্ট পদ্ধতি নিয়ে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষক পদে শূন্যতা পূরণ না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীকে নিয়মিত কয়েক মাস পর্যন্ত পাঠদান থেকে বঞ্চিত থাকতে হয়। এসব সমস্যার প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলনে পরে অন্যরাও যোগ দেন। তারা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বিশেষ করে জ্বালানির দাম নিয়ে ক্ষোভ জানান। যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার পর হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ও দাম নিয়ে উদ্বেগ আরো বেড়েছে।
ফ্রান্সের অন্যতম বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন জেনারেল কনফেডারেশন অব লেবার (সিজিটি) বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। সংগঠনটি দ্রব্যমূল্য কমানো, পেনশন বাড়ানো এবং মজুরি বৃদ্ধির দাবি তুলেছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর দুই মেয়াদের শাসনের শেষ পর্যায় চলছে। দেশটিতে আগামী ২০২৭ সালের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা।
স্পেনে গত সেপ্টেম্বরে বাড়ির দাম ও ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে রাজপথে নামেন অধিকারকর্মীরা। ৮৭ বছর বয়সি মারিকারমেন আবাসকালকে তার বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটায়। একটি বিনিয়োগ তহবিল তার বাড়িভাড়া ২৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছিল। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দুই সপ্তাহ পর মারা যান তিনি। বিক্ষোভকারীরা বাড়িভাড়া কমানো, উচ্ছেদ বন্ধ এবং বিনিয়োগ তহবিলের আবাসন কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানিয়েছেন।
স্পেনের সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ভাড়াটেদের সুরক্ষায় জরুরি আবাসন আইন পাসের চেষ্টা করেছিলেন। তবে পার্লামেন্টে ডানপন্থি ও উগ্রডানপন্থি দলগুলোর বিরোধিতায় আইনটি পাস হয়নি। এরপর ২৯ নভেম্বর আগাম নির্বাচনের ডাক দেন সানচেজ। সংস্কার কার্যকর করতে তার আরো বিস্তৃত প্রগতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তিনি।
নির্বাচনের আগে পার্লামেন্টের স্থায়ী পরিষদের মাধ্যমে আবাসনসংক্রান্ত কিছু অধ্যাদেশ পাস করাতে পারলে স্পেনের বিক্ষোভ কমতে পারে। সানচেজের সমাজতান্ত্রিক দল ও রক্ষণশীল পিপলস পার্টি—দুই পক্ষই আগামী নির্বাচনে জিতলে আরো বাড়ি নির্মাণ এবং আবাসন সংকট সমাধানে গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
স্পেনের প্রতিবেশী পর্তুগালেও শনিবার আবাসন সংকটের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। রাজধানী লিসবনের কেন্দ্রীয় এলাকায় জড়ো হন শত শত মানুষ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পর্তুগালে বাড়ির দাম বেড়েছে ১২৪ শতাংশ। এই বৃদ্ধির হার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। বাড়ির দাম ও ভাড়া সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় আবাসন সংকট এখন দেশটির অন্যতম বড় উদ্বেগ।
ইতালিতে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভ, ইতালির মিলানেও সংসার চালানোর ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। শনিবারের মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও পরে সহিংসতায় রূপ নেয়। মুখোশ পরা বিক্ষোভকারীরা দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত পুলিশের দিকে পাথর, পেভমেন্টের ব্লকসহ বিভিন্ন বস্তু ছোড়েন। বার ও রেস্তোরাঁর টেবিল দিয়ে তৈরি প্রতিবন্ধকতায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
ইতালিতে শনিবারই জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভের প্রথম দিন ছিল। এদিকে ফ্রান্সের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বেলজিয়ামেও বিক্ষোভ হয়েছে।
ফ্রান্সে শিক্ষকসংকট মোকাবিলায় আরো তিন হাজার অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। বিদ্যালয় পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদেরও যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। আগামী বছরের বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু নিবন্ধন ফি বাড়ানোর যে পরিকল্পনা ছিল, তা-ও বাতিল করেছে সরকার।





Add comment