গসিপ করলে শরীরে কী ঘটে?

গসিপ বা পরচর্চা নিয়ে সমাজে নানা ধরনের ধারণা রয়েছে। কেউ এটিকে সময় নষ্টের কাজ বলে মনে করেন, আবার কেউ মনে করেন এটি মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক। বাস্তবতা হলো, গসিপ মানুষের শরীর ও মনের ওপর প্রভাব ফেলে, তবে সেই প্রভাব ইতিবাচক না নেতিবাচক হবে, তা নির্ভর করে গসিপের ধরন, মাত্রা এবং প্রেক্ষাপটের ওপর।

গবেষণায় দেখা গেছে, গসিপ করার সময় শরীরে অক্সিটোসিন হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। এই হরমোনকে সাধারণত ‘লাভ হরমোন’ বা ‘বন্ডিং হরমোন’ বলা হয়। এটি মানুষের মধ্যে বিশ্বাস, সংযোগ এবং সম্পর্ক গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে গসিপের সময় অনেকেই স্বস্তি ও আনন্দ অনুভব করেন। মস্তিষ্কে এক ধরনের ‘রিওয়ার্ড’ বা পুরস্কারের অনুভূতি তৈরি হয়, যা মানুষকে নিজের সামাজিক গোষ্ঠীর অংশ হিসেবে অনুভব করতে সহায়তা করে।

গসিপ মানসিক চাপ কমানোর একটি মাধ্যম হিসেবেও কাজ করতে পারে। যখন কেউ অন্য কারও সম্পর্কে কথা বলেন, তখন অনেক সময় নিজের আবেগ ও অনুভূতিও প্রকাশ করেন। এই আবেগ প্রকাশের সুযোগ মানসিক চাপ হালকা করতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে গসিপ সামাজিক আচরণ নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পরচর্চার মাধ্যমে অসৎ বা প্রতারণামূলক আচরণ সম্পর্কে অন্যদের সতর্ক করা সম্ভব হয়। ফলে এটি সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

গসিপ অনেক সময় অন্যদের রক্ষা করার একটি উপায় হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। কেউ যদি নিজের খারাপ অভিজ্ঞতা, যেমন চুরি বা প্রতারণার ঘটনা শেয়ার করেন, তাহলে তা অন্যদের সতর্ক করতে সহায়ক হয়। এ ধরনের গসিপকে ‘প্রোসোশ্যাল গসিপ’ বলা হয়, যার উদ্দেশ্য অন্যকে সাহায্য করা বা সচেতন করা।

সামাজিক সংযোগ তৈরিতেও গসিপের ভূমিকা রয়েছে। মানুষ স্বভাবতই সামাজিক প্রাণী এবং প্রাচীনকাল থেকেই গসিপের মাধ্যমে সম্পর্ক তৈরি করে এসেছে। ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা সহকর্মীদের সঙ্গে গসিপ করলে এক ধরনের বন্ধন তৈরি হয়, যা মানসিকভাবে স্বস্তি দেয়। এই সংযোগ মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

কখনো কখনো অন্যের সমস্যা শুনে মানুষ নিজের অবস্থাকে তুলনামূলক ভালো মনে করে, যা সাময়িক স্বস্তি এনে দিতে পারে। এছাড়া গসিপের মাধ্যমে অনেক সময় সামাজিক তথ্য, সম্পর্ক বা আচরণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়, যা মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে সাহায্য করে।

তবে সব গসিপই ইতিবাচক নয়। যখন গসিপের উদ্দেশ্য হয় কাউকে ছোট করা, অপমান করা বা ক্ষতি করা, তখন তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ ধরনের গসিপ ব্যক্তির মধ্যে অপরাধবোধ তৈরি করতে পারে এবং পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে পারে। অতিরিক্ত নেতিবাচক গসিপ মানসিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দিতে পারে এবং সময় ও শক্তির অপচয় ঘটায়।

গসিপের প্রভাব হৃদ্‌যন্ত্র ও মস্তিষ্কের ওপরও পড়ে। যদি গসিপ হালকা, নিরীহ ও আনন্দদায়ক হয়, তাহলে এটি স্ট্রেস হরমোন যেমন কর্টিসলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করতে পারে। ফলে হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর চাপ কমে, যা হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ বজায় থাকায় মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে এবং মানসিক সুস্থতা বজায় থাকে।

তবে গসিপ যদি ভুল বোঝাবুঝি বা দ্বন্দ্ব তৈরি করে, তাহলে তা উল্টো মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়, যা হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। সব সময় অন্যের বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকলে নিজের মানসিক শান্তি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। পাশাপাশি নিজের মনোযোগ ও সৃজনশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, গসিপ সম্পূর্ণ খারাপ নয় কিংবা সম্পূর্ণ ভালোও নয়। এটি কীভাবে, কতটা এবং কোন উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে, তার ওপরই নির্ভর করে এর প্রভাব।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed