সাংবাদিক কামরুজ্জামান বাবলুকে চোখ বেঁধে অপহরণের পর হত্যার চেষ্টা

ম্যাসেঞ্জারে কিছুদিন যোগাযোগের পর রাজধানীর পোস্তগোলা এলাকায় ডেকে নেয়া হয়। কথা ছিল কিছু ‘গোপন তথ্য’ জানানো হবে। অফিস থেকে পোস্তগোলায় গেলে তাদের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়। চা পানের কথা বলে দু’ ব্যক্তি একটি মাইক্রোবাসের কাছে নিয়ে ধাক্কা দিয়ে গাড়ীতে তুলে চোখ বেঁধে অপহরণ করে সাংবাদিক কামরুজ্জামান বাবলুকে (৪৪)। গত ৩০ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে এই ঘটনা জানতে পেরে পরিবারে দেখা দেয় আতঙ্ক। সাংবাদিক মহলে অত্যন্ত পরিচিত মুখ বাবলু। গাড়ীতে উঠেই দেখেন সেখানে আগে থেকে আরও ৪ জন অবস্থান করছে। তাদের হাতে অস্ত্র। তারা বাবলুকে কিল ঘুষি দিয়ে গুরুতর আহত করে হাত ও চোখ বেঁধে ফেলে এবং মুখে কসটেপ আটকিয়ে হত্যার হুমকি দিতে থাকে। এসময় চালক গাড়ীটি দ্রুতগতিতে চালাতে থাকে। চোখ বেঁধে ফেলায় বাবলু তখন বুঝতে পারেননি কোথায় তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।

অপহরণকারীদের গাড়ী অনুমান ৪ ঘন্টা চলার পর নীরব একটি এলাকায় গিয়ে থামে। তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। সেখানে চোখ খুলে দিলে নিজেকে গহিন এক জঙ্গলে দেখতে পান বাবলু। সবার হাতে ধারালো ছুরি আর অস্ত্র। এসময় তিনি নিজেকে জিম্মি অবস্থায় দেখতে পেয়ে আতঙ্কে ভেঙ্গে পড়েন। সন্ত্রাসিদের কথা না শুনলে তারা বাবলুকে কেটে নদীর রাক্ষুসে মাছ দিয়ে খাওয়ানোর হুমকি দেয়। তার সাথে থাকা দামি মোবাইল সেট, ডেভিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, পাসওয়ার্ড তারা নিয়ে নেয়। মারধর করে পরিবারের কাছে ফোন করায়। আটক অবস্থায় ব্যাংকে থাকা ২ লাখ টাকা তুলে নেয় সন্ত্রাসিরা। বিকাশে আরও টাকা নেয়ার চেষ্টা চলছিল। তাকে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে অপহরণ করে হত্যার চেষ্টা চালায় তারা। ভোর রাতের দিকে সুযোগ বুঝে সেখান থেকে কৌশলে পালিয়ে আসতে পেরেছেন তিনি। এসব তথ্য ফোনে আজকাল-এর এই প্রতিবেদককে গতকাল বৃস্পতিবার ঢাকা থেকে জানান ভিকটিম কামরুজ্জামান বাবলু। মুক্তির পর দেখতে পান খুলনার প্রত্যন্ত এলাকায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক কল্যাণ সম্পাদক সাংবাদিক কামরুজ্জামান বাবলু জাতীয় দৈনিক এদিন’র বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত আছেন। এ ঘটনায় তিনি ঢাকার সিএমএম আদালতে ৬ অক্টোবর, ২০২৬ অপহরণের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছেন। আদালত শ্যামপুর থানার ওসিকে এফআইআর গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। তার প্রেক্ষিতে এসআরবিকে তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অভিযোগে প্রকাশ, প্রায় দুই মাস আগে ফেসবুকের মেসেঞ্জারে ‘মামুন শেখ’ নামে একটি আইডির সঙ্গে কামরুজ্জামান বাবলুর পরিচয় হয়। প্রথমে সাধারণ কথাবার্তা হলেও একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের উৎস হিসেবে পরিচয় দেন। সাংবাদিক পরিচয় জানার পর তিনি বিটকয়েনসহ বিভিন্ন বিষয়ে ‘চাঞ্চল্যকর তথ্য’ দেওয়ার আশ্বাস দেন। গত ৩০ সেপ্টেম্বর বুধবার ঢাকায় আসার কথা জানিয়ে ‘মামুন শেখ’ সাংবাদিক কামরুজ্জামান বাবলুকে দেখা করার প্রস্তাব দেন। মামুনকে অফিসে আসতে বললে মামুন জানান, তিনি জুরাইনে আত্মীয়ের বাসায় রয়েছেন। পরে জুরাইনে এসে দেখা করার অনুরোধ করলে কামরুজ্জামান বাবলু সেখানে যান।

অভিযোগে জানা যায়, ওই দিন দুপুর আড়াইটার দিকে পোস্তগোলা ব্রিজসংলগ্ন আলম মার্কেটের সামনে তাঁদের দেখা হয়। এ সময় মামুন তাঁর বন্ধু ‘অনিক’ নামে একজনের সঙ্গে তাকে পরিচয় করিয়ে দেন। পরে নিরিবিলি পরিবেশে চা পানের কথা বলে তাঁকে একটি মাইক্রোবাসের কাছে নেওয়া হয়। হঠাৎ তাকে ধাক্কা দিয়ে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে অস্ত্রের মুখে চুপ থাকতে বাধ্য করা হয়।

অভিযোগে বলা হয়েছে, অপরাধিরা শাসিয়েছে তিনি সরকারের বিরুদ্ধে এবং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখালেখি করেন। একই সঙ্গে তাঁর কাছে বিভিন্ন তথ্য চাওয়ার বিষয় নিয়েও অপহরণকারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে তাঁকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার কথা উল্লেখ করে ভয় দেখানো হয় এবং হত্যার পর তার মরদেহ মাছকে খাওয়ানোর হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন সাংবাদিক কামরুজ্জামান বাবলু।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, রাত ৯টার দিকে তাঁর স্ত্রী ফোন করলে অপহরণকারীরা তাঁকে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে বাধ্য করে। তবে কথাবার্তার মধ্যেই তাঁর স্ত্রী পরিস্থিতি আঁচ করতে পারেন। পরে তিনি কামরুজ্জামানের বড় ভাইদের বিষয়টি জানান। স্বজনরা পল্টন থানায় গিয়ে বিষয়টি জানালে থানার একজন এসআই যোগাযোগের চেষ্টা করেন।

অপহরণকারীরা তাঁর ব্যাংক কার্ড ব্যবহার করে টাকা উত্তোলন করে নেয়। ব্যাংক হিসাবের তথ্য অনুযায়ী, গোপালগঞ্জের একটি এটিএম বুথ থেকে টাকা উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী। পরে তাঁকে আরও টাকা দিতে চাপ দেওয়া হয়। তাঁর নিজের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠানো হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।

এ ঘটনায় নিজের ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, বিকাশের লেনদেনের তথ্য, টাকা উত্তোলনের তথ্য, ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর এবং মোবাইল ফোনের আইএমইআই নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য আদালতে দাখিল করেছেন বলে জানিয়েছেন কামরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘ঘটনার পর থেকে আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। আমি চাই, তদন্ত করে যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক।’
এদিকে ডিআরইউ কার্যনির্বাহী কমিটির পক্ষ থেকে সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। ডিআরইউ নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে এর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed