মাকড়সার জালে বিস্ময়কর স্থিতিস্থাপক রহস্য

অস্ট্রেলিয়ার একটি বিশেষ প্রজাতির নেট-কাস্টিং মাকড়সা এমন এক শিকারি জাল তৈরি করে, যা সাধারণ মাকড়সার রেশমের তুলনায় অনেক বেশি প্রসারিত হতে সক্ষম এবং ছিঁড়ে না গিয়ে আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে। এই অসাধারণ স্থিতিস্থাপকতার ফলে মাকড়সাটি তার তৈরি জাল শিকারের দিকে নিক্ষেপ করতে পারে এবং শিকার আটকে যাওয়ার পরও জালটি অক্ষত থাকে।

জার্মানির গ্রাইফসোয়াল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষকের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, এই মাকড়সার জালের অস্বাভাবিক প্রসারণ ও পুনরুদ্ধারের পেছনে রয়েছে জালের বিশেষ নকশা। জালের কেন্দ্রীয় সুতাগুলো আক্রমণের সময় প্রায় ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত লম্বা হতে পারে এবং পরে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। ইলেকট্রনিক মাইক্রোস্কোপে পরীক্ষা করে গবেষকেরা লক্ষ্য করেছেন, এই রেশমের একটি নরম কেন্দ্র রয়েছে, যা কুণ্ডলী পাকানো তন্তু দিয়ে ঘেরা। জাল প্রসারিত হওয়ার সময় এই কুণ্ডলিগুলো প্রথমে সোজা হয়ে যায়, ফলে শুরুতে সুতাটি নমনীয় থাকে এবং পরবর্তী টানে তা শক্ত প্রতিরোধ তৈরি করে।

গবেষক জানান, শিকার ধরার এই রেশমে উলের মতো একটি বাঁকানো কাঠামো বিদ্যমান, যা মাকড়সাকে দ্রুত জাল নিক্ষেপে সহায়তা করে। এই কাঠামোর কারণে জালটি দ্রুত খুলে যায় এবং কোনোভাবেই দুর্বল বা ঝুলে পড়া ফাঁদে পরিণত হয় না। জাল তৈরির সময় মাকড়সা কেবল সুতা ছড়িয়ে দেয় না, বরং তার পেছনের পা দিয়ে সুতাগুলো বারবার টেনে এবং পুনরায় গুছিয়ে নেয়। প্রতিটি ধাপে পেটের কাছে থাকা স্পিনারেট থেকে সুতা বের করার সময় অতিরিক্ত তন্তুগুলো কুণ্ডলীতে ভাঁজ করে রাখা হয়। এই প্রক্রিয়ার ফলে জালের কিছু অংশ অন্য অংশের তুলনায় অনেক বেশি স্থিতিস্থাপক হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, জালের আচরণ অনেকটাই নির্ভর করে মাকড়সার এই সূক্ষ্ম নির্মাণ কৌশলের ওপর।

শিকারি জালের সব সুতা একই ধরনের ভূমিকা পালন করে না। জালের উপরের ও ফ্রেমের সুতাগুলো বেশ দৃঢ় থাকে, আর নিচের অংশের সুতাগুলো তুলনামূলকভাবে নরম। কারণ, এই অংশগুলোই সবচেয়ে বেশি প্রসারণের কাজ করে। আক্রমণের সময় জালের কেন্দ্রীয় অংশ মাত্র ৭০ থেকে ১২৬ মিলিসেকেন্ডের মধ্যে ৮ থেকে ২৪ গুণ পর্যন্ত প্রসারিত হতে পারে। এই সুসংগঠিত প্রসারণ ব্যবস্থার ফলে অসম টান পড়লেও জাল ছিঁড়ে যায় না।

দীর্ঘদিন ধরে প্রকৌশলীরা এমন তন্তু বা ফাইবার তৈরির চেষ্টা করে আসছেন, যা সহজে বাঁকানো যাবে কিন্তু চাপ বাড়লে ভেঙে পড়বে না। এই মাকড়সার জালের গঠন সেই লক্ষ্য পূরণের একটি কার্যকর উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে। গবেষকদের মতে, এই নকশা অনুসরণ করে ভবিষ্যতে সার্জিক্যাল স্যুচার, কৃত্রিম লিগামেন্ট, শক শোষণকারী টেক্সটাইল এবং হালকা অথচ টেকসই যন্ত্রাংশ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

নেট-কাস্টিং মাকড়সার শিকার ধরার কৌশলও আলাদা ধরনের। এটি অন্য মাকড়সার মতো স্থির জাল পেতে বসে থাকে না; বরং জালটি সামনের পায়ে ধরে রাখে এবং সুযোগ বুঝে তা শিকারের দিকে ছুড়ে দেয়। রাতের বেলায় বড় চোখের সাহায্যে শিকারের দূরত্ব নির্ধারণ করে নিখুঁতভাবে আক্রমণ চালায়। টিকে থাকার এই প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশই সম্ভবত বিবর্তনের মাধ্যমে তাদের জালে এমন বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে।

২০২৫ সালে রয়্যাল সোসাইটি পাবলিশিং ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতায় এই বিশেষ জালের একটি ছবি পুরস্কৃত হয়, যা শুধু বিজ্ঞানীদের নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed