পেশাগত জীবনে একসঙ্গে একাধিক কাজ করার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। প্রযুক্তিনির্ভর কর্মপরিবেশ, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ এবং সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকেই মাল্টিটাস্কিংকে দক্ষতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাল্টিটাস্কিং সবসময় ইতিবাচক ফল দেয় না; বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি উৎপাদনশীলতা ও কাজের মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
কর্মক্ষেত্রে মাল্টিটাস্কিং বলতে বোঝায় একসঙ্গে একাধিক কাজ পরিচালনা করা বা খুব দ্রুত এক কাজ থেকে আরেক কাজে সরে যাওয়া। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের কাছ থেকে এই দক্ষতা আশা করে, বিশেষ করে যেখানে একাধিক দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাতে হয়। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মস্তিষ্ক প্রকৃতপক্ষে একই সময়ে একাধিক জটিল কাজ দক্ষতার সঙ্গে করতে পারে না। বরং এটি দ্রুত কাজ বদলানোর মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা করে, যাকে বলা হয় ‘টাস্ক সুইচিং’।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই টাস্ক সুইচিংয়ের ফলে মনোযোগ ভেঙে যায় এবং কাজের গুণগত মান কমে যেতে পারে। একটি কাজ থেকে অন্য কাজে বারবার মনোযোগ সরানোর কারণে মস্তিষ্ককে পুনরায় ফোকাস করতে সময় লাগে। এতে করে কাজ শেষ করতে বেশি সময় লাগে এবং ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে।
তবে মাল্টিটাস্কিং সম্পূর্ণভাবে নেতিবাচক এমন নয়। কিছু ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, সহজ বা অভ্যাসগত কাজগুলো একসঙ্গে করা গেলে সময় বাঁচানো সম্ভব। যেমন ইমেইল চেক করার পাশাপাশি হালকা কোনো প্রশাসনিক কাজ করা। কিন্তু যখন কাজগুলো জটিল বা গভীর মনোযোগের প্রয়োজন হয়, তখন মাল্টিটাস্কিং বরং ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।
পেশাগত জীবনে মাল্টিটাস্কিংয়ের আরেকটি বড় প্রভাব হলো মানসিক চাপ বৃদ্ধি। একসঙ্গে অনেক কাজের চাপ নেওয়ার ফলে অনেকেই ক্লান্তি, উদ্বেগ এবং কর্মক্ষেত্রে বার্নআউটের মতো সমস্যায় পড়েন। দীর্ঘমেয়াদে এটি কর্মদক্ষতা কমিয়ে দিতে পারে এবং ব্যক্তিগত জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এছাড়া মাল্টিটাস্কিংয়ের কারণে কাজের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। একাধিক কাজ একসঙ্গে করতে গিয়ে কোনটি আগে করা উচিত, তা ঠিকভাবে বোঝা যায় না। ফলে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো পিছিয়ে যেতে পারে, যা পেশাগত সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞরা তাই মাল্টিটাস্কিংয়ের পরিবর্তে ‘সিঙ্গেল টাস্কিং’ বা এক সময়ে একটি কাজে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন। এতে কাজের মান উন্নত হয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সহজ হয়। পাশাপাশি সময় ব্যবস্থাপনা ও কাজের পরিকল্পনা ঠিকভাবে করলে মাল্টিটাস্কিংয়ের প্রয়োজনও অনেকাংশে কমে যায়।
তাদের মতে, দিনের কাজগুলোকে অগ্রাধিকার অনুযায়ী ভাগ করে নেওয়া, নির্দিষ্ট সময় ধরে একটি কাজ করা এবং মাঝেমধ্যে বিরতি নেওয়া কর্মক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। এতে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয় এবং কাজের প্রতি আগ্রহও বজায় থাকে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মাল্টিটাস্কিংকে দক্ষতা হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবে এটি সবসময় কার্যকর নয়। বরং সচেতনভাবে কাজের ধরন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। সঠিক পদ্ধতিতে কাজ করলে পেশাগত জীবনে দক্ষতা ও সফলতা দুটোই অর্জন করা সম্ভব।





Add comment