আরব সাগরের পূর্বাঞ্চলের গভীর সমুদ্রে বসবাসকারী বোটলনোজ ডলফিনদের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাণিজ্যিক জাহাজের তীব্র শব্দের কারণে এসব সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের ধরন বদলে ফেলছে। দলগত বন্ধন বজায় রাখা, শিকার ধরা, পথ নির্ধারণ কিংবা বিপদের সংকেত দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে তারা এখন ভিন্ন ধরনের শব্দ ব্যবহার করছে।
বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত সামুদ্রিক করিডর হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলের জলপথ দিয়ে নিয়মিত চলাচল করে কনটেইনার জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকার। পারস্য উপসাগর, ভারত এবং পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান পথ হওয়ায় এখানে প্রায় সারাক্ষণই জাহাজ চলাচল অব্যাহত থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবিরাম যাতায়াত সমুদ্রের স্বাভাবিক শব্দ পরিবেশকে বদলে দিচ্ছে এবং এর প্রভাব পড়ছে সমুদ্রের জীববৈচিত্র্যের ওপর।
চেন্নাইয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ওশান টেকনোলজির সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাণিজ্যিক জাহাজ ও ট্যাংকারের উৎপন্ন শব্দ ডলফিনদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত করছে। প্রায় ছয় মাস ধরে সংগৃহীত ডলফিনদের শব্দ বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা লক্ষ্য করেছেন, জাহাজের উপস্থিতির সময় ডলফিনদের শিস বা সংকেতধর্মী শব্দের কম্পাঙ্ক আগের তুলনায় বেশি তীক্ষ্ণ হয়ে যায়।
শুধু কম্পাঙ্ক নয়, শব্দের স্থায়িত্বেও পরিবর্তন দেখা গেছে। আগে যেখানে সংকেতগুলো তুলনামূলকভাবে স্বল্প সময় স্থায়ী হতো, সেখানে এখন তা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠছে। পাশাপাশি শব্দের জটিলতা বা বৈচিত্র্য কমে গিয়ে তা অনেক বেশি সরল হয়ে পড়ছে। গবেষকেরা মনে করছেন, এই পরিবর্তন মূলত জাহাজের তীব্র শব্দের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি অভিযোজনমূলক আচরণ।
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত এক বিজ্ঞানীর মতে, যখন জাহাজের শব্দের কম্পাঙ্ক ডলফিনদের যোগাযোগের কম্পাঙ্কের সঙ্গে মিলে যায়, তখন তাদের সংকেত অন্য ডলফিনদের কাছে স্পষ্টভাবে পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি হয়। এ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে ডলফিনরা নিজেদের স্বরের তীক্ষ্ণতা বাড়িয়ে দেয় এবং সংকেতের সময়ও দীর্ঘ করে। বিজ্ঞানীদের ভাষায় এই অভিযোজনকে বলা হয় ‘লম্বার্ড ইফেক্ট’, যা অনেক প্রাণীর মধ্যেই শব্দপূর্ণ পরিবেশে যোগাযোগ বজায় রাখতে দেখা যায়।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব উদ্বেগজনক হতে পারে। সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানীদের মতে, ডলফিনদের শব্দের জটিলতা কমে যাওয়ার অর্থ হলো তাদের তথ্য আদান–প্রদানের পরিমাণও কমে যাচ্ছে। এর ফলে মা ডলফিন ও তার সন্তানের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি দলগতভাবে শিকার ধরার মতো সমন্বিত আচরণেও বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
দীর্ঘ সময় ধরে এমন শব্দদূষণের মধ্যে থাকলে সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীদের আচরণে স্থায়ী নেতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন গবেষকেরা। অতীতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলেও এ ধরনের ঘটনার নজির পাওয়া গেছে। ১৯৯৯ সালে কানাডার সেন্ট লরেন্স নদীতে বেলুগা তিমির মধ্যে শব্দের প্রভাবে আচরণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা হয়েছিল। পরে ২০১৩ সালে উত্তর অ্যাড্রিয়াটিক সাগরে ডলফিনদের মধ্যেও একই ধরনের পরিবর্তনের তথ্য সামনে আসে।
এর পাশাপাশি ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, অত্যন্ত কোলাহলপূর্ণ সামুদ্রিক পরিবেশে ডলফিনরা নিজেদের ডাককে আরও সহজ ও সংক্ষিপ্ত করে ফেলে। এতে তাদের যোগাযোগের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিছু উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন ২০৩০ সালের মধ্যে জাহাজ থেকে উৎপন্ন গড় শব্দ তিন ডেসিবেল কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাহাজের প্রপেলার ও হালের নকশায় পরিবর্তন আনলে শব্দদূষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতে পারে।
গবেষকেরা বলছেন, সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষায় জাহাজ চলাচলের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় সমুদ্রের প্রাণীরা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়ে আরও বেশি পরিবর্তনের পথে হাঁটতে পারে।





Add comment