বাংলাদেশের সিলেটের একটি শান্ত গ্রাম থেকে শুরু হওয়া এক তরুণের স্বপ্নযাত্রা আজ প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে অনুপ্রেরণার গল্প হিসেবে আলোচিত। জীবনের নানা সংগ্রাম ও পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে নিজের লক্ষ্য ধরে রেখে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন এক জীবন গড়ে তুলেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক শামসুল হক।
সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার বাঘার গ্রামে জন্ম ও শৈশব কাটে তাঁর। ছোটবেলা থেকেই পরিবার ও গ্রামের পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই তরুণের মনে ছিল বড় স্বপ্ন দেখার সাহস। জীবনের সম্ভাবনাকে বিস্তৃত করার লক্ষ্যেই তিনি ১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। সেই সময় অনেকের মতো তাঁর কাছেও বিদেশের জীবন ছিল নতুন চ্যালেঞ্জ ও অনিশ্চয়তায় ভরা।
যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে প্রথমদিকে জীবিকা নির্বাহের জন্য বিভিন্ন ছোটখাটো কাজ করতে হয়েছে তাঁকে। শুরুতে একটি রেস্তোরাঁয় বাস বয় হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে ডেলিভারিম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ধীরে ধীরে পরিশ্রম ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তিনি রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও যুক্ত হন এবং ম্যানেজার হিসেবেও কাজ করেন। তবে এই কাজগুলো ছিল তাঁর জীবনের পথচলার অংশমাত্র; এগুলোর ভেতর দিয়েই তিনি নিজের লক্ষ্যকে ধরে রেখেছিলেন।
অভিবাসী জীবনের কঠিন বাস্তবতার মাঝেও তিনি শিক্ষার গুরুত্ব কখনো ভুলে যাননি। দিনের পর দিন কাজ করার পাশাপাশি নিজের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের ফল হিসেবে ১৯৯৭ সালে তিনি ডিপ্লোমা অর্জন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার পথ আরও বিস্তৃত করতে তিনি নিউইয়র্কের লাগার্ডিয়া কমিউনিটি কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে অ্যাসোসিয়েট ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
পরবর্তীতে তিনি নিউইয়র্কের বারুক কলেজে ভর্তি হয়ে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এই ধাপগুলো তাঁর শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে ওঠে। পড়াশোনার প্রতি অদম্য আগ্রহ ও নিজেকে উন্নত করার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে আরও এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।
এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখানে জনপ্রশাসনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। একজন অভিবাসী হিসেবে বিদেশের মাটিতে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করা তাঁর জীবনের এক বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়।
বর্তমানে তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের কুইন্স এলাকায় বসবাস করছেন। পারিবারিক জীবন, শিক্ষা এবং সংগ্রামের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে তাঁর জীবনযাত্রা অনেক প্রবাসী বাংলাদেশির কাছে প্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে। একটি গ্রাম থেকে শুরু করে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নগরীতে স্থায়ী জীবন গড়ে তোলা তাঁর যাত্রা অনেকের কাছেই উদাহরণ হয়ে রয়েছে।
প্রবাসে প্রতিষ্ঠিত হলেও নিজের শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ বজায় রেখেছেন তিনি। সিলেটের সেই গ্রামের স্মৃতি ও শৈশবের অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রয়ে গেছে। জীবনের প্রতিটি ধাপে কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য এবং লক্ষ্যপূরণের ইচ্ছাই তাঁকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
আজ তাঁর জীবনকাহিনি প্রমাণ করে, স্বপ্ন যদি অটুট থাকে এবং তার জন্য নিরলস পরিশ্রম করা যায়, তাহলে সীমিত সুযোগ থেকেও নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে যেতে পারে। সিলেটের একটি গ্রামের তরুণ থেকে নিউইয়র্কের প্রবাসী জীবনে নিজের অবস্থান তৈরি করার এই গল্প তাই অনেকের কাছেই সাহস ও অনুপ্রেরণার উৎস।





Add comment