বিশ্বজুড়ে যুদ্ধকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে অসংখ্য চলচ্চিত্র। এসব সিনেমার বেশির ভাগেই যুদ্ধের ভয়াবহতা ও মানবিক সংকটকে তুলে ধরে শক্তিশালী যুদ্ধবিরোধী বার্তা দেওয়া হয়েছে। কোনোটি দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে, আবার কোনোটি অর্জন করেছে মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুরস্কার। যুদ্ধ নিয়ে নির্মিত সেরা চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে কোনগুলো সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চলচ্চিত্র মূল্যায়নভিত্তিক জনপ্রিয় ওয়েবসাইট রোটেন টমেটোজ একসময় যুদ্ধভিত্তিক সেরা ১০০ সিনেমার একটি তালিকা প্রকাশ করে। সেই তালিকা থেকে নির্বাচিত শীর্ষ ১০টি চলচ্চিত্রের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো।
তালিকার দশম স্থানে রয়েছে ১৯৮১ সালে নির্মিত পশ্চিম জার্মান চলচ্চিত্র ‘ডাস বুট’। চলচ্চিত্রটির নির্মাতা একজন জার্মান পরিচালক, আর এতে অভিনয় করেছেন জার্মান অভিনেতা ও সংগীতশিল্পীরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার জার্মান সাবমেরিন অভিযানের অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে নির্মিত এ চলচ্চিত্রে যুদ্ধের বাস্তবতা ও সৈন্যদের মানসিক চাপকে গভীরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সাবমেরিনের ভেতরের সংকীর্ণ পরিবেশে ক্রুদের ভয়, উদ্বেগ এবং পারস্পরিক সম্পর্কের জটিলতা এই সিনেমার প্রধান উপজীব্য।
নবম স্থানে রয়েছে ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা এক জার্মান লেখকের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ১৯৩০ সালের এই চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন একজন মার্কিন নির্মাতা। মুক্তির পর এটি দুটি অস্কার পুরস্কার অর্জন করে। লেখক নিজে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়ায় উপন্যাসটিতে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত বাস্তবভাবে ফুটে উঠেছে। অনেকের মতে, এটিই ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী যুদ্ধবিরোধী চলচ্চিত্র।
অষ্টম স্থানে রয়েছে ১৯৬৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ অর: হাউ আই লার্নড টু স্টপ ওরিং অ্যান্ড লাভ দ্য বম্ব’। শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই ব্ল্যাক কমেডি চলচ্চিত্রে দেখানো হয়েছে, মানসিক ভারসাম্যহীন এক সামরিক কর্মকর্তা সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে পারমাণবিক হামলার নির্দেশ দেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকিকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করায় এটি সর্বকালের অন্যতম সেরা কমেডি চলচ্চিত্র হিসেবেও বিবেচিত হয়।
সপ্তম স্থানে রয়েছে ১৯৭৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘অ্যাপোক্যালিপস নাউ’। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত এই চলচ্চিত্রের কাহিনি একটি গোপন সামরিক অভিযানের ওপর ভিত্তি করে। একজন সেনা কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় বিদ্রোহী এক মার্কিন অফিসারকে খুঁজে বের করে নিয়ন্ত্রণে আনা বা হত্যা করার জন্য। মুক্তির পর চলচ্চিত্রটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে সর্বোচ্চ সম্মান স্বর্ণপাম অর্জন করে এবং বক্স অফিসেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়।
ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে ‘শিন্ডলার্স লিস্ট’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পোল্যান্ডে জার্মান দখলদারিত্বের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে এক জার্মান ব্যবসায়ীর মানবিক উদ্যোগের গল্প তুলে ধরা হয়েছে, যিনি নিজের কারখানায় কর্মরত ইহুদি শ্রমিকদের জীবন রক্ষা করার চেষ্টা করেন। একটি উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমাটি মুক্তির পর সাতটি অস্কার পুরস্কার অর্জন করে এবং ইতিহাসভিত্তিক চলচ্চিত্র হিসেবে ব্যাপক প্রশংসা পায়।
পঞ্চম স্থানে রয়েছে ‘হেনরি ৫’। শতবর্ষের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে ইংল্যান্ডের এক রাজার ফ্রান্স জয়ের অভিযানের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। এটি শুধু যুদ্ধের কাহিনি নয়, বরং নেতৃত্ব, সাহস এবং নৈতিক সংকটের গল্পও বটে। শেক্সপিয়ারের নাটক অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি সমালোচক ও দর্শকদের প্রশংসা অর্জন করে।
চতুর্থ স্থানে রয়েছে ‘ব্যাটল অব আলজিয়ার্স’। ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৭ সালের মধ্যে আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়কার ঘটনাবলি নিয়ে নির্মিত ইতালীয়-আলজেরীয় এই রাজনৈতিক চলচ্চিত্রে ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে আলজেরীয়দের সশস্ত্র সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে। তথ্যচিত্রধর্মী বাস্তবধর্মী উপস্থাপনার জন্য এটি বিশ্বজুড়ে বিশেষভাবে আলোচিত।
তৃতীয় স্থানে রয়েছে ‘কাসাব্লাঙ্কা’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে শরণার্থীদের জীবনসংগ্রাম এবং প্রেমের গল্প একসঙ্গে উঠে এসেছে। জার্মান বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে অনেক মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়ের পথ খুঁজতে মরক্কোর কাসাব্লাঙ্কা শহরে আসে। সেই শহরে বসবাসকারী এক ক্যাফে মালিকের জীবনে হঠাৎ ফিরে আসে তার সাবেক প্রেমিকা, যার স্বামী একজন বিদ্রোহী নেতা। তাদের পলায়নের গল্প নিয়েই এগিয়েছে ছবির কাহিনি।
দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ফরাসি নির্মাতা পরিচালিত ‘আ ম্যান এস্কেপড’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানদের হাতে বন্দী এক ফরাসি প্রতিরোধযোদ্ধার স্মৃতিকথা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে এক বন্দীর পালানোর প্রচেষ্টা তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৫৭ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে এটি প্রদর্শিত হয় এবং নির্মাতা সেরা পরিচালকের পুরস্কার পান।
তালিকার শীর্ষে রয়েছে জাপানি অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র ‘গ্রেভ অব দ্য ফায়ারফ্লাইস’। একটি আধা আত্মজীবনীমূলক ছোটগল্প অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমার কাহিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ সময়ে জাপানের কোবি শহরে দুই যুদ্ধঅনাথ ভাইবোনের বেঁচে থাকার সংগ্রামকে কেন্দ্র করে। যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়কে অত্যন্ত আবেগঘনভাবে তুলে ধরার জন্য চলচ্চিত্রটি বিশ্বব্যাপী সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছে এবং অনেকের মতে এটি সর্বকালের সেরা অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রগুলোর অন্যতম।





Add comment