জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সবার থেকে এগিয়ে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা অনেক মানুষের মধ্যেই দেখা যায়। একাডেমিক জীবন, ব্যক্তিগত অর্জন কিংবা পেশাগত ক্ষেত্র—সব জায়গাতেই সর্বোচ্চ সফলতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে কেউ কেউ নিরন্তর পরিশ্রম করে চলেন। অনেকের কাছে সফলতাই হয়ে ওঠে জীবনের প্রধান অগ্রাধিকার, যেখানে ঘুম, শারীরিক সুস্থতা কিংবা মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি অনেক সময় পিছিয়ে পড়ে। প্রতিদিন নিজের সীমা ছাড়িয়ে কাজ করে যাওয়ার এই প্রবণতা অনেককে ‘হাই পারফরমার’ হিসেবে পরিচিত করে তোলে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের জীবনধারা দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
উচ্চ পারফরম্যান্স ধরে রাখতে অনেক মানুষকে দীর্ঘ সময় ধরে শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রম করতে হয়। প্রায় প্রতিদিনই তারা নানা ধরনের চাপের মধ্যে কাজ করেন। দীর্ঘদিন ধরে এমন চাপের পরিবেশে থাকলে শরীর ও মনের ওপর এর প্রভাব পড়া স্বাভাবিক। বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই ধরনের চাপপূর্ণ জীবনযাপনের কারণে অনেক ক্ষেত্রে হৃৎপিণ্ডের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
এটি কেবল সাধারণ স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয় নয়। কারণ দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা চাপ, ক্লান্তি ও মানসিক অবসাদ সরাসরি হৃদ্যন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধক্ষমতাও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এর ফলে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে এবং শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে।
কাজের ধরন ও জীবনযাপনের ধরণ অনুসারে অনেক সময় ওজন বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা কিংবা অনিয়মিত জীবনযাপনের কারণে জয়েন্ট ও পেশির সমস্যাও দেখা দিতে পারে। এমনকি দীর্ঘস্থায়ী চাপের কারণে মস্তিষ্কের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু নির্দিষ্ট ধরনের হাই পারফরমারদের ক্ষেত্রে হৃদ্রোগের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়।
প্রথমত, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এ ক্ষেত্রে একটি বড় কারণ। যাঁরা সপ্তাহে প্রায় ৫৪ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় কাজ করেন, অর্থাৎ সপ্তাহে ছয় দিন প্রতিদিন প্রায় নয় ঘণ্টা করে কর্মঘণ্টা পার করেন, তাঁদের মধ্যে করোনারি হার্ট ডিজিজের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত চাপ ও উদ্বেগ হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যখন মানুষ দীর্ঘ সময় চাপের মধ্যে থাকে, তখন শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এই হরমোনগুলো উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং শরীরে দীর্ঘমেয়াদি ইনফ্লেমেশন তৈরি করতে ভূমিকা রাখে।
তৃতীয়ত, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুমের অভাবও হৃদ্যন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীর স্বাভাবিক ‘রিল্যাক্সেশন’ পর্যায়ে যেতে পারে না। এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে শরীর চাপের মধ্যে থাকে এবং হৃৎপিণ্ডের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে।
চতুর্থত, অনিয়মিত ব্যায়ামও ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অনেক সময় কেউ কেউ হঠাৎ করে বেশি শারীরিক কসরত বা ভারী ব্যায়াম শুরু করেন, যাতে হঠাৎ করে হৃদ্যন্ত্রের ওপর চাপ পড়ে। আবার নিয়মিত ও পরিমিত ব্যায়ামের অভাবও হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
পঞ্চমত, ‘পুশ থ্রু’ মনোভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক হাই পারফরমার তীব্র চাপ সহ্য করার মানসিকতা নিয়ে কাজ করেন। ফলে শরীরে ক্লান্তি, ব্যথা বা অস্বস্তির মতো প্রাথমিক লক্ষণগুলো তারা প্রায়ই উপেক্ষা করেন। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয়ে যায়।
তবে মনে রাখা জরুরি যে, কর্মক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করা মানেই হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়া নয়। বরং সফলতার পথে যদি অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, দীর্ঘস্থায়ী চাপ এবং বিশ্রামের অভাব তৈরি হয়, তখনই ঝুঁকি বাড়তে পারে। অর্থাৎ সফলতা নিজে কোনো সমস্যা নয়, সমস্যা তৈরি হয় যখন কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু সহজ অভ্যাস হৃদ্স্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। প্রতিদিন সাত থেকে আট ঘণ্টা গভীর ঘুম নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট নিয়মিত ব্যায়াম করা উচিত। দীর্ঘ সময় কাজের মাঝে ছোট ছোট বিরতি নেওয়াও শরীর ও মনের জন্য উপকারী।
এ ছাড়া কর্মক্ষেত্রের চাপ যেন বাড়ির জীবনে প্রভাব না ফেলে, সে বিষয়েও সচেতন থাকতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে ঘরে বসে কাজ করার পরিবেশে এই সীমারেখা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে, যা চাপ বাড়াতে পারে। তাই স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণের জন্য ধ্যান, শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম কিংবা অন্যান্য মানসিক প্রশান্তির পদ্ধতি অনুসরণ করা উপকারী হতে পারে। পাশাপাশি নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মাত্রা পরীক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।





Add comment