চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। একটি চাকরির জন্য হাজার হাজার আবেদন জমা পড়ে, আর নিয়োগদাতাদের হাতে থাকে খুবই সীমিত সময়। এতগুলো কাগুজে সিভির ভিড়ে নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরা অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে ওঠে। শুধু লিখিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে একজন প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব বা আত্মবিশ্বাস বোঝা সবসময় সম্ভব হয় না। এ কারণেই ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ভিডিও সিভি। প্রথাগত কাগুজে সিভির পাশাপাশি একটি ছোট ভিডিও এখন অনেক সময় প্রার্থীকে বাড়তি সুবিধা এনে দিচ্ছে। ভিডিও সিভির মাধ্যমে একজন প্রার্থী নিজের অভিজ্ঞতা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাস সরাসরি উপস্থাপন করার সুযোগ পান। ফলে নিয়োগদাতার কাছেও প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা তৈরি হয়।
তবে ভিডিও সিভি তৈরি করার আগে একটি বিষয় ভেবে নেওয়া জরুরি। সব ধরনের চাকরির জন্য এটি সমানভাবে প্রয়োজনীয় নয়। বিশেষ করে মার্কেটিং, সেলস, মিডিয়া বা ভিডিও এডিটিংয়ের মতো পেশায় ভিডিও সিভি বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ এসব পেশায় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, উপস্থাপনা এবং আত্মবিশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্যদিকে যেসব কাজ মূলত পর্দার আড়ালে করা হয় অথবা খুব বেশি প্রযুক্তিনির্ভর, সেসব ক্ষেত্রে ভিডিও সিভির প্রয়োজন তুলনামূলক কম। তাই ভিডিও সিভি তৈরি করার আগে চাকরির ধরন বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
ভিডিও সিভি তৈরি করার সময় একটি বিষয় বিশেষভাবে মাথায় রাখা প্রয়োজন, সেটি হলো সময়ের সীমা। ভিডিওটি খুব বেশি দীর্ঘ হওয়া উচিত নয়। সাধারণত দুই মিনিটের মধ্যে পুরো বক্তব্য শেষ করা সবচেয়ে কার্যকর বলে মনে করা হয়। ভিডিও দীর্ঘ হয়ে গেলে অনেক সময় নিয়োগদাতা আগ্রহ হারাতে পারেন। তাই আগে থেকে একটি সংক্ষিপ্ত খসড়া তৈরি করে নেওয়া ভালো। তবে বক্তব্য যেন একেবারে মুখস্থ বা যান্ত্রিক না শোনায়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। কথাবার্তা হবে স্বাভাবিক, সাবলীল এবং সংক্ষিপ্ত। অপ্রয়োজনীয় তথ্য বা অতিরিক্ত কথা ভিডিওটিকে ভারী করে তুলতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কাগজের সিভির কথার পুনরাবৃত্তি না করা। অনেকেই ভিডিও সিভিতে কাগুজে সিভিতে থাকা একই তথ্য আবারও বলতে শুরু করেন, যা আসলে সময়ের অপচয়। কাগজের সিভি সাধারণত প্রার্থীর কাজের ইতিহাস তুলে ধরে। কিন্তু ভিডিও সিভির উদ্দেশ্য ভিন্ন। এখানে প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব, যোগাযোগ দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাস তুলে ধরার সুযোগ থাকে। তাই ভিডিওতে এমন কিছু বিষয় তুলে ধরা উচিত, যা লিখিত সিভিতে উল্লেখ করা হয়নি। বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতা, কাজের প্রতি আগ্রহ বা নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি এখানে সংক্ষেপে তুলে ধরা যেতে পারে।
ভিডিও তৈরির সময় পরিবেশ এবং পোশাকের দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একটি ভালো ভিডিও তৈরি করতে খুব দামি ক্যামেরার প্রয়োজন নেই। তবে আশপাশের পরিবেশ যেন পরিষ্কার ও গোছানো থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। দিনের আলো ব্যবহার করে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ভিডিও ধারণ করা হলে সেটি বেশ স্বাভাবিক ও পরিষ্কার দেখায়। প্রয়োজনে রিং লাইট ব্যবহার করা যেতে পারে। পোশাকের ক্ষেত্রেও ইন্টারভিউয়ের মতো মার্জিত ও পেশাদার পোশাক পরা উচিত। পেছনের দৃশ্য যেন এলোমেলো বা বিশৃঙ্খল না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখা জরুরি।
ভিডিও সিভির মূল শক্তি হলো প্রার্থীর প্রাণশক্তি ও আত্মবিশ্বাস। নিয়োগদাতারা সাধারণত এমন প্রার্থী খোঁজেন, যারা নিজেদের কাজের প্রতি আগ্রহী এবং উদ্যমী। দুইজন প্রার্থীর যোগ্যতা যদি প্রায় সমান হয়, তবে যার উপস্থাপনা বেশি প্রাণবন্ত, তিনি অনেক সময় এগিয়ে যান। তাই ভিডিও রেকর্ড করার আগে নিজের কণ্ঠস্বর, ভঙ্গি এবং উপস্থাপন ভেবে নেওয়া প্রয়োজন। কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস ও কাজের প্রতি আগ্রহ ফুটে উঠলে সেটি নিয়োগদাতার কাছে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেয়।
ভিডিও সিভি জমা দেওয়ার ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করা ভালো। সাধারণত ভিডিও ফাইল সরাসরি ই-মেইলে সংযুক্ত না করাই উত্তম। বরং ভিডিওটি প্রথমে ইউটিউব বা ভিমিওর মতো প্ল্যাটফর্মে আপলোড করা যেতে পারে। এরপর প্রাইভেসি সেটিং ‘আনলিস্টেড’ করে দেওয়া হলে শুধুমাত্র লিংক থাকলেই ভিডিওটি দেখা সম্ভব হবে। এরপর সেই লিংকটি সিভির শুরুতে বা কভার লেটারে যুক্ত করা যায়। অনেকেই চাইলে সিভিতে একটি কিউআর কোডও যোগ করেন, যা স্ক্যান করলেই সরাসরি ভিডিওটি চালু হয়ে যায়।
ভিডিও সিভি নিয়োগকর্তাকে একজন প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব বোঝার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সহায়তা করে। এর মাধ্যমে যোগাযোগ দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং উপস্থাপনার ক্ষমতা সহজেই প্রকাশ পায়। তবে এটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে ভিডিও সিভি কখনোই প্রথাগত সিভির বিকল্প নয়। বরং এটি একটি সহায়ক উপাদান হিসেবে কাজ করে। বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক স্টার্টআপ এবং বড় প্রতিষ্ঠান প্রার্থীদের আত্মবিশ্বাস ও যোগাযোগ দক্ষতা মূল্যায়নের জন্য ভিডিও সিভিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করছে।





Add comment