নারী বিজ্ঞানীদের ১১ উদ্ভাবনে বদলে গেছে পৃথিবী

ইতিহাসে বড় বড় আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের কথা উঠলেই সাধারণত কয়েকজন বিখ্যাত পুরুষ উদ্ভাবকের নামই বেশি উচ্চারিত হয়। কিন্তু বাস্তবে এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও আবিষ্কার রয়েছে, যেগুলোর পেছনে অবদান রেখেছেন নারী বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকেরা। তাঁদের অনেকের নাম সাধারণ মানুষের কাছে তেমন পরিচিত না হলেও আধুনিক জীবনের বহু সুবিধা তাঁদের চিন্তা ও গবেষণার ফল। দৈনন্দিন জীবনের নানা ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে উন্নত প্রযুক্তি পর্যন্ত বহু ক্ষেত্রে নারীদের উদ্ভাবন বিশ্বকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এমন ১১টি উদ্ভাবনের কথা এখানে তুলে ধরা হলো, যেগুলোর পেছনে ছিলেন নারী বিজ্ঞানীরা।

বিশ্বের প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে পরিচিত ব্রিটিশ গণিতবিদ অ্যাডা লাভলেস। উনবিংশ শতাব্দীর এই বিজ্ঞানী ১৮৪৩ সালে বিশ্লেষণী যন্ত্রের জন্য একটি অ্যালগরিদম তৈরি করেন, যা যন্ত্রের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করার উদ্দেশ্যে লেখা ইতিহাসের প্রথম কম্পিউটার নির্দেশনা হিসেবে ধরা হয়। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে ভবিষ্যতের কম্পিউটার শুধু সংখ্যা গণনায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং প্রতীক ব্যবহার করে সংগীত বা গ্রাফিকস তৈরিতেও সক্ষম হবে। বিশ্লেষণী যন্ত্র নিয়ে কাজ করার সময় তিনি বিস্তারিত নোট লিখেছিলেন, যেখানে বার্নোলি সংখ্যা নির্ণয়ের পদ্ধতি ব্যাখ্যা করা হয়। প্রযুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর দূরদর্শী চিন্তা আজও বিস্ময় জাগায়।

কম্পিউটার সফটওয়্যার উন্নয়নের ইতিহাসেও এক নারী বিজ্ঞানীর অবদান গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন নৌবাহিনীর এক রিয়ার অ্যাডমিরালকে মার্ক–১ নামের কম্পিউটারে কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯৫০-এর দশকে তিনি কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের অগ্রদূত হয়ে ওঠেন। তাঁর উদ্ভাবিত কম্পাইলার প্রযুক্তি মানুষের ভাষায় লেখা নির্দেশনাকে কম্পিউটারের বোধগম্য সংকেতে রূপান্তর করার সুযোগ দেয়। এর ফলে প্রোগ্রামিং প্রক্রিয়া অনেক দ্রুত ও কার্যকর হয়ে ওঠে। বর্তমানে ব্যবহৃত ‘ডিবাগিং’ শব্দটিকেও জনপ্রিয় করে তোলার কৃতিত্ব তাঁর।

টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়নেও নারীদের অবদান রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এক তাত্ত্বিক পদার্থবিদের গবেষণার ফলেই কলার আইডি ও কল ওয়েটিং প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি হয়। ১৯৭০-এর দশকে পরিচালিত তাঁর গবেষণা পরবর্তী সময়ে পোর্টেবল ফ্যাক্স, ফাইবার অপটিক কেবল এবং সোলার সেল প্রযুক্তির পথ উন্মুক্ত করতে সহায়তা করে। তিনি ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে পিএইচডি অর্জনকারী প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান নারী হিসেবেও পরিচিত।

গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন ওয়াইপার আবিষ্কারের পেছনেও ছিলেন এক নারী উদ্ভাবক। ১৯০৩ সালে নিউইয়র্কে ভ্রমণের সময় তিনি লক্ষ্য করেন, চালককে বারবার জানালা খুলে তুষার সরাতে হচ্ছে। এতে শীতের মধ্যে যাত্রীদের কষ্ট পেতে হয়। এই সমস্যার সমাধান হিসেবে তিনি গাড়ির ভেতর থেকেই চালানো যায় এমন রাবার ব্লেডযুক্ত একটি যন্ত্রের নকশা তৈরি করেন এবং একই বছর পেটেন্ট পান। যদিও প্রথমদিকে গাড়ি নির্মাতারা এটি গ্রহণ করেননি, পরে এটি সব গাড়ির অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন পরিচালনায় ব্যবহৃত দীর্ঘস্থায়ী নিকেল-হাইড্রোজেন ব্যাটারি প্রযুক্তির পেছনেও এক নারী বিজ্ঞানীর অবদান রয়েছে। ১৯৮০-এর দশকে উদ্ভাবিত এই ব্যাটারি মহাকাশ স্টেশনের কার্যক্রম সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তীতে তিনি নাসার গ্লেন রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

স্বয়ংক্রিয় ডিশওয়াশার উদ্ভাবনের গল্পও বেশ ব্যতিক্রমী। নিয়মিত অতিথি আপ্যায়নের সময় থালাবাসন পরিষ্কারের ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে এক নারী উদ্ভাবক এমন একটি যন্ত্র তৈরি করেন, যা পানির চাপ ও ঘূর্ণনশীল ব্যবস্থার মাধ্যমে থালা ধুতে পারে। স্বামীর মৃত্যুর পর আর্থিক সংকটে পড়ে তিনি ১৮৮৬ সালে এই যন্ত্রের পেটেন্ট নেন এবং নিজস্ব কারখানা স্থাপন করেন।

আধুনিক হোম সিকিউরিটি সিস্টেমের ধারণার সূত্রপাতও এক নারীর চিন্তা থেকে। পেশায় নার্স হওয়ায় তিনি প্রায়ই বাড়িতে একা থাকতেন। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই তিনি এমন একটি ক্যামেরা ব্যবস্থা তৈরি করেন, যা দরজার বাইরে থাকা ব্যক্তিকে পর্যবেক্ষণ করতে পারত এবং ঘরের মনিটরে তা দেখা যেত। এই ব্যবস্থায় অ্যালার্ম বাটনও যুক্ত ছিল, যা আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচিত হয়।

স্টেম সেল গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এনে দেন আরেক নারী বিজ্ঞানী। তাঁর উদ্ভাবিত স্টেম সেল আইসোলেশন প্রযুক্তি রক্তসংবহনতন্ত্র বোঝার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে এবং ক্যানসার চিকিৎসার গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে।

বুলেটপ্রুফ ভেস্ট তৈরিতে ব্যবহৃত শক্তিশালী তন্তু কেভলারও আবিষ্কার করেন এক নারী রসায়নবিদ। ১৯৬৫ সালে উদ্ভাবিত এই উপাদানটি ইস্পাতের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি শক্তিশালী। বর্তমানে এটি বডি আর্মার, গ্লাভস, মোবাইল ফোন এবং বিভিন্ন প্রকৌশল কাঠামোতে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিশ্বখ্যাত বোর্ড গেম মনোপলির মূল ধারণাটিও আসে এক নারী উদ্ভাবকের কাছ থেকে। তিনি ১৯০৪ সালে ‘দ্য ল্যান্ডলর্ডস গেম’ নামে একটি খেলার পেটেন্ট নেন, যার উদ্দেশ্য ছিল পুঁজিবাদের নেতিবাচক দিক তুলে ধরা। পরে একটি কোম্পানি তাঁর কাছ থেকে পেটেন্ট কিনে নিয়ে সেটিকে ‘মনোপলি’ নামে বাজারে ছাড়ে।

অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এক হলিউড অভিনেত্রী ও উদ্ভাবক সুরকারের সঙ্গে যৌথভাবে এমন একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করেন, যা রেডিও নিয়ন্ত্রিত টর্পেডোর সংকেতকে শত্রুর জ্যামিং থেকে রক্ষা করতে পারত। ফ্রিকোয়েন্সি-হপিং প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই পদ্ধতিই পরে আধুনিক ব্লুটুথ, ওয়াই-ফাই ও জিপিএস প্রযুক্তির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

এই সব উদ্ভাবন প্রমাণ করে যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতিতে নারীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসে তাঁদের নাম অনেক সময় আড়ালে থেকে গেলেও আধুনিক বিশ্বের অসংখ্য প্রযুক্তির পেছনে রয়েছে তাঁদের মেধা ও উদ্ভাবনী চিন্তা।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed