Bp News USA

শি জিনপিংয়ের রোবট ভরসা কৌশল

বেইজিং থেকে পাওয়া খবরে জানা যায়, চীনের জন্মহার ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এর ফলে আগামী কয়েক দশকে দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশাল শ্রমশক্তি ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে এবং পেনশনভোগী অবসরপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এই জনসংখ্যাগত ভারসাম্যহীনতা দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা, সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন।

সন্তান জন্মে উৎসাহ দিতে চীনা কর্তৃপক্ষ একাধিক নীতি গ্রহণ করেছে। নগদ প্রণোদনা, কর ছাড় এবং বিয়ে সহজ করার নতুন বিধানসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে গত মাসে প্রকাশিত তথ্য বলছে, এসব উদ্যোগ সত্ত্বেও জন্মহার কমার ধারা থামানো যায়নি।

এমন প্রেক্ষাপটে চীন আরেকটি সম্ভাব্য সমাধানের দিকে নজর দিচ্ছে, আর তা হলো রোবট ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি। চীনা নেতা শি জিনপিং বহু বছর ধরে দেশের উৎপাদন খাত আধুনিকীকরণ ও স্বয়ংক্রিয়করণের উদ্যোগ তদারকি করে আসছেন। বেইজিংয়ের লক্ষ্য চীনকে একটি স্বনির্ভর উচ্চপ্রযুক্তি শক্তিতে রূপান্তর করা। বর্তমানে জনসংখ্যার পুনর্বিন্যাসজনিত চাপ মোকাবিলার তাগিদ সেই শিল্প নীতির সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি সামাল দেওয়া না গেলে পেনশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে পরিবারগুলোর স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়বে এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে। এতে অর্থনৈতিক আস্থা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হংকং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জনমিতি বিশেষজ্ঞ স্টুয়ার্ট গিয়েটেল-বাস্টেন বলেন, গত দুই থেকে তিন দশকের নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অমিল বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, স্বয়ংক্রিয়তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সঠিক বিনিয়োগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে জনসংখ্যাগত খাদের মুখে পড়া থেকে অন্তত কয়েক দশক রক্ষা করতে পারে। তবে উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর এই রূপান্তর সহজ নয়। স্বল্পমেয়াদে এটি কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে কাজের ধরন পাল্টে দেবে। ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের দেশে, যেখানে দীর্ঘদিনের প্রবৃদ্ধি বিস্তৃত শ্রমশক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেখানে এই রূপান্তর বিশেষ চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি অধ্যাপক গুওজুন হে বলেন, রোবট, ডিজিটালাইজেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে শ্রম উৎপাদনশীলতা বাড়ানো গেলে কম শ্রমিক দিয়েও শিল্প উৎপাদন বজায় রাখা বা বাড়ানো সম্ভব। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এটি শ্রমশক্তি সংকোচনের প্রভাব পুরোপুরি দূর করতে পারবে না এবং বিভিন্ন খাতে প্রভাব ভিন্ন হবে। শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য নীতির সমন্বয় প্রয়োজন হবে।

আন্তর্জাতিক রোবট ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে স্থাপিত শিল্প রোবটের অর্ধেকেরও বেশি চীনে বসানো হয়েছে। দেশটি বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম শিল্প রোবট বাজার। কারখানাগুলোতে রোবটিক বাহু দিয়ে ওয়েল্ডিং, রং করা ও সংযোজনের কাজ চলছে। এমনকি আলো ছাড়াই পরিচালিত তথাকথিত ডার্ক ফ্যাক্টরিও গড়ে উঠেছে। উচ্চমাত্রার স্বয়ংক্রিয়তা বৈদ্যুতিক যান ও সৌর প্যানেলের মতো আধুনিক পণ্য কম খরচে ব্যাপক পরিসরে উৎপাদনে সহায়তা করছে।

বেইজিং মানবসদৃশ রোবট উন্নয়নেও বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। ১৪০টির বেশি প্রতিষ্ঠান এ খাতে কাজ করছে এবং সরকারি ভর্তুকি পাচ্ছে। এসব রোবট এখনো মূলত প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রদর্শনী হিসেবে দেখা গেলেও কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদন লাইন, লজিস্টিক কেন্দ্র ও গবেষণাগারে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার শুরু হয়েছে। নির্মাতাদের দাবি, হ্যান্ডলিং, বাছাই ও মান নিয়ন্ত্রণের মতো কাজে মানবসম উৎপাদনশীলতার কাছাকাছি পৌঁছাতে তারা অগ্রসর হচ্ছে।

জনসংখ্যা বার্ধক্যের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়ও রোবট ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমানে ৬০ বছরের বেশি বয়সী জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার ২৩ শতাংশ, যা ২১০০ সালের মধ্যে অর্ধেকের বেশি হতে পারে। এক সন্তান নীতির উত্তরাধিকারসূত্রে অনেক পরিবারে একমাত্র সন্তানকেই বৃদ্ধ পিতামাতার দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক নির্দেশনায় প্রবীণ সেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, এক্সোস্কেলেটন রোবট ও সহায়ক প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় পেনশন ব্যবস্থাও চাপের মুখে রয়েছে। বিশ্লেষক তিয়ানজেং সু মনে করেন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যদি শ্রম উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে, তবে কম কর্মী দিয়েও পেনশন ব্যবস্থায় অবদান বজায় রাখা সম্ভব হতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, জনসংখ্যা হ্রাস ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির এই প্রতিযোগিতায় দীর্ঘমেয়াদে ভারসাম্য রাখা কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি রূপান্তরের ফলে কর্মসংস্থানে সাময়িক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। কিছু খাতে শ্রমিকের ঘাটতি থাকলেও অন্য খাতে বেকারত্ব বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। দেশীয় বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবট প্রযুক্তি উৎপাদন খাতের প্রায় ৭০ শতাংশ কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলতে পারে। সরকার ইতিমধ্যে কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব মোকাবিলায় নীতিমালা আনার কথা জানিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জোর দিচ্ছেন পুনঃদক্ষতা ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগের ওপর, যাতে শ্রমিকেরা পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ থেকে সরে এসে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার সঙ্গে কাজ করতে পারেন বা উচ্চমূল্য সংযোজন খাতে প্রবেশ করতে পারেন। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার এবং পেনশন সংস্কার অব্যাহত রাখার কথাও বলা হয়েছে। ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো অবসরের বয়স বাড়ানো হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, জন্মহার নিম্নমুখী থাকা সত্ত্বেও জনসংখ্যা ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর হ্রাস ধীরে ধীরে ঘটবে, ফলে সমন্বয়ের কিছু সময় রয়েছে। তবে বেইজিং এখন যে প্রস্তুতি নেবে, তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শুধু চীনের ভেতরেই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রতিফলিত হবে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed