ক্যালকেনিয়াল স্পার, যা হিল স্পার নামেও পরিচিত, হলো পায়ের গোড়ালির হাড়ের নিচের অংশে বা পেছনের দিকে কাঁটার মতো বাড়তি হাড়ের গঠন। দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত চাপ, টান ও প্রদাহের ফলেই সাধারণত এই অস্বাভাবিক হাড়ের বৃদ্ধি তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি প্লান্টার ফাসাইটিসের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে, ফলে রোগীর অস্বস্তি আরও তীব্র হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গোড়ালির নিচে অবস্থিত প্লান্টার ফ্যাসিয়া নামের টিস্যু দীর্ঘ সময় ধরে টান বা চাপের মধ্যে থাকলে সেখানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রদাহ তৈরি হয়। সেই প্রদাহ দীর্ঘস্থায়ী হলে শরীর প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া হিসেবে ওই স্থানে অতিরিক্ত হাড় জমাতে শুরু করে। ধীরে ধীরে সেটিই ক্যালকেনিয়াল স্পার হিসেবে দৃশ্যমান হয়।
কেন হয়
গোড়ালি ব্যথার এ সমস্যার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে কাজ করা এর অন্যতম প্রধান কারণ। যারা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকেন, তাদের পায়ের নিচের অংশে ধারাবাহিক চাপ পড়ে। অতিরিক্ত ওজনও ঝুঁকি বাড়ায়, কারণ শরীরের বাড়তি ওজন গোড়ালির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
শক্ত বা কুশনবিহীন জুতা ব্যবহারের কারণে পায়ের স্বাভাবিক শক অ্যাবজরবিং ক্ষমতা কমে যায়, ফলে গোড়ালিতে বাড়তি চাপ পড়ে। দীর্ঘদিন প্লান্টার ফ্যাসিয়ায় টান থাকলেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। যাদের ফ্ল্যাট ফুট বা পায়ের আর্চজনিত গঠনগত সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টিস্যুর স্থিতিস্থাপকতা কমে যাওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
লক্ষণ
ক্যালকেনিয়াল স্পারের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম পা ফেলতেই তীব্র গোড়ালির ব্যথা অনুভব করা। অনেক রোগী জানান, কিছুক্ষণ হাঁটার পর ব্যথা কিছুটা কমে আসে। তবে বেশি সময় হাঁটা বা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে আবার ব্যথা বেড়ে যায়।
গোড়ালির নিচে চাপ দিলে তীব্র অস্বস্তি অনুভূত হয়। দীর্ঘদিন সমস্যা অবহেলা করলে হাঁটার স্বাভাবিক ভঙ্গি বদলে যেতে পারে, যা পরবর্তীতে হাঁটু বা কোমরেও ব্যথার কারণ হতে পারে।
রোগনির্ণয়
রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে প্রথমেই রোগীর বিস্তারিত ইতিহাস নেওয়া হয় এবং শারীরিক পরীক্ষা করা হয়। ব্যথার ধরন, সময়কাল ও তীব্রতা মূল্যায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ। নিশ্চিত হওয়ার জন্য পায়ের এক্স-রে করা হয়, যাতে গোড়ালির নিচে অতিরিক্ত হাড়ের বৃদ্ধি আছে কি না তা স্পষ্ট বোঝা যায়।
চিকিৎসা
চিকিৎসা সাধারণত ধাপে ধাপে পরিচালিত হয়। স্বল্পমেয়াদে ব্যথানাশক ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে, যাতে প্রদাহ ও ব্যথা নিয়ন্ত্রণে থাকে।
ফিজিয়াট্রিক ব্যবস্থাপনা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আলট্রাসাউন্ড থেরাপি, আইএফটি বা টেনস প্রয়োগ ব্যথা কমাতে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি প্লান্টার ফাসা ও একিলিস টেনডনের স্ট্রেংদেনিং এক্সারসাইজ করানো হয়। হিল প্যাড, সিলিকন হিল কাপ বা উপযুক্ত ইনসোল ব্যবহার গোড়ালির ওপর চাপ কমাতে কার্যকর।
কিছু জটিল ক্ষেত্রে স্টেরয়েড ইনজেকশন প্রয়োজন হতে পারে, বিশেষ করে যখন দীর্ঘদিনের প্রদাহ অন্য কোনো চিকিৎসায় নিয়ন্ত্রণে আসে না।
করণীয়
নরম ও কুশনযুক্ত জুতা ব্যবহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘুম থেকে ওঠার পর হঠাৎ দাঁড়িয়ে না গিয়ে আগে হালকা স্ট্রেচিং করলে ব্যথা কম অনুভূত হতে পারে। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নিয়মিত উপযুক্ত ব্যায়াম করা গোড়ালির ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে সহায়ক।
যা করবেন না
খালি পায়ে হাঁটা এড়িয়ে চলা উচিত, বিশেষ করে শক্ত মেঝেতে। শক্ত বা পুরোনো স্যান্ডেল ব্যবহার করলে সমস্যা বাড়তে পারে। হঠাৎ করে বেশি হাঁটা বা দৌড়ানো থেকেও বিরত থাকা প্রয়োজন, কারণ এতে গোড়ালিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।
সময়ে সঠিক ব্যবস্থা নিলে ক্যালকেনিয়াল স্পার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব এবং দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা এড়ানো যায়। অবহেলা করলে ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে দৈনন্দিন চলাফেরায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।







Add comment