খাবারের স্বাদ ও গন্ধ বাড়াতে বিশ্বজুড়ে রসুনের ব্যবহার সুপরিচিত। তবে কিছু দেশে এটি কেবল রান্নার উপকরণ নয়, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসেরও অংশ। চীনের দক্ষিণাঞ্চলের গুয়াংডং প্রদেশে বিয়ের একটি প্রাচীন রীতিতে রসুন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। সেখানে কনের পক্ষ থেকে বরের পরিবারকে রসুন উপহার দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই উপহার অশুভ শক্তিকে দূরে রাখে এবং নবদম্পতির সংসারে ইতিবাচক শক্তি প্রবাহিত করে।
চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় রসুন উৎপাদক দেশ হিসেবে পরিচিত। ভোক্তা হিসেবেও দেশটি শীর্ষে অবস্থান করছে। আদা, পেঁয়াজ কলি ও ধনেপাতার পাশাপাশি চীনের প্রায় সব অঞ্চলের রান্নায় রসুন নিয়মিত ব্যবহৃত হয়। শুধু খাদ্যেই নয়, দেশটির ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতিতেও রসুনের গুরুত্ব রয়েছে। সেখানে ধারণা করা হয়, রসুন রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক, হৃদ্যন্ত্র সুস্থ রাখতে ভূমিকা রাখে এবং শরীরের প্রদাহ কমায়।
তবে গুয়াংডং প্রদেশের গ্রামীণ হাক্কা অঞ্চলে রসুনের ভূমিকা আরও আলাদা মাত্রা পেয়েছে। বিয়ের দিনে কনের পরিবারের সদস্যরা রসুনসহ বিভিন্ন রান্নার উপকরণ নান্দনিকভাবে সাজিয়ে প্রস্তুত করেন। এরপর সেগুলো লাল ফিতা দিয়ে বেঁধে পাঠানো হয় বরের বাড়িতে। এই উপহারকে কেবল আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি নবদম্পতির ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য শুভকামনা ও আশীর্বাদের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
উপহারের ঝুলিতে রসুন ছাড়াও আরও কিছু উপকরণ থাকে। এর মধ্যে ধনেপাতার মতো একটি উপাদান অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা নতুন সংসারে কনের পরিশ্রমী হওয়ার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। পেঁয়াজের কলি রাখা হয় সুস্থ সন্তানের প্রত্যাশা প্রকাশ করতে। আর রসুনকে দেখা হয় সংসারের খরচ–খরচা সামলানোর দক্ষতার প্রতীক হিসেবে। অর্থাৎ প্রতিটি উপকরণই একটি নির্দিষ্ট বার্তা বহন করে, যা নবদম্পতির ভবিষ্যৎ জীবনযাত্রার বিভিন্ন দিককে নির্দেশ করে।
দক্ষিণ চীনে রসুন ঘিরে আরও কিছু ঐতিহ্যগত চর্চা রয়েছে। অনেক পরিবার ঘরের ভেতরে রসুন ঝুলিয়ে রাখেন। কখনো কখনো শরীরেও এটি বেঁধে রাখার রীতি দেখা যায়। বিশ্বাস করা হয়, এসবের মাধ্যমে অশুভ শক্তি দূরে থাকে। কৃষিজীবী এলাকাগুলোতে ভালো ফলনের আশায় শস্যের সঙ্গেও রসুন সংরক্ষণ করা হয়।
এই বিশ্বাসগুলোর পেছনে স্থানীয় পরিবেশগত বাস্তবতাও জড়িয়ে আছে। দক্ষিণ চীনের আবহাওয়া সাধারণত স্যাঁতসেঁতে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে আর্দ্রতা বেড়ে গেলে খাবার দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, আসবাবে ছত্রাক ধরে এবং দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। প্রাচীনকালে এসব সমস্যার পেছনে অশুভ আত্মার প্রভাব রয়েছে বলে ধারণা করা হতো। ফলে অশুভ শক্তি প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে রসুনের ব্যবহার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
ঋতুভেদে রসুন ব্যবহারেরও আলাদা রীতি রয়েছে সেখানে। বসন্ত ও গ্রীষ্মে ছত্রাক ও অতিরিক্ত আর্দ্রতা মোকাবিলায় রসুন ব্যবহার করা হয়। শরৎকালে এটি অশুভ শক্তি দূর করার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। আর শীতকালে রসুন ঠান্ডা থেকে সুরক্ষা দেবে বলে বিশ্বাস করা হয়। এমনকি ঘরের দক্ষিণ–পশ্চিম দিকে রসুন রাখারও একটি প্রচলিত ধারা রয়েছে। স্থানীয়দের ধারণা, এভাবে রাখলে ঘরে ইতিবাচক শক্তির ভারসাম্য ভালোভাবে বজায় থাকে।
সব মিলিয়ে, গুয়াংডংয়ের এই বিয়ের রীতি শুধু একটি উপহার বিনিময়ের বিষয় নয়; এটি ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও সামাজিক মূল্যবোধের সমন্বিত প্রতিফলন। রান্নাঘরের পরিচিত উপাদান রসুন সেখানে হয়ে উঠেছে শুভকামনা, সুরক্ষা ও ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির প্রতীক।







Add comment