যুক্তরাষ্ট্রের আইডাহো অঙ্গরাজ্যে একটি অভিবাসন অভিযানের জেরে শত শত মানুষকে আটক করার ঘটনায় ফেডারেল, অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযানে প্রায় ৪০০ জনকে চার ঘণ্টা ধরে আটক রাখা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে, যাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও শিশুরাও ছিলেন। মামলায় দাবি করা হয়েছে, ওই সময় তাদের খাবার ও পানির সুযোগ দেওয়া হয়নি।
আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন মঙ্গলবার এই মামলা দায়ের করে। অভিযোগে বলা হয়, গত ১৯ অক্টোবর ওয়াইল্ডার শহরের লা ক্যাথেড্রাল রেসট্র্যাকে এ অভিযান পরিচালিত হয়। স্থানটি লাতিনো পরিবারগুলোর কাছে জনপ্রিয় এবং সেখানে মেক্সিকান সংস্কৃতি উদযাপন করা হয়।
৬৪ পৃষ্ঠার শ্রেণিভিত্তিক অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, সেদিন ২০০ জনের বেশি কর্মকর্তা সাঁজোয়া যান ও হেলিকপ্টার নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। কর্মকর্তাদের হাতে অস্ত্র ছিল এবং ফ্ল্যাশ ব্যাঙ গ্রেনেড ব্যবহার করা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, অভিভাবক ও শিশুদের অস্ত্রের মুখে জিপ টাই দিয়ে বেঁধে রাখা হয় এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবমাননাকর আচরণের শিকার হতে হয়।
এই মামলায় একটি সম্ভাব্য শ্রেণির পক্ষে এবং তিনটি লাতিনো পরিবারের হয়ে অভিযোগ আনা হয়েছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বা বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা। বিবাদীদের তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট, এফবিআই, আইডাহো স্টেট পুলিশসহ বিভিন্ন স্থানীয় সংস্থা।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের একজন মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, ওয়াইল্ডারের ওই সম্পত্তিতে অবৈধ ঘোড়দৌড়, প্রাণী লড়াই ও জুয়া কার্যক্রম ভেঙে দিতে অভিযান চালানো হয় এবং ১০৫ জন অবৈধ অভিবাসীকে আইনসম্মতভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, শিশুদের জিপ টাই দিয়ে বাঁধা বা গ্রেপ্তার করা হয়নি এবং এই মামলা অবৈধ অভিবাসীদের গণ বহিষ্কার কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার প্রচেষ্টা।
এফবিআইয়ের একজন মুখপাত্র সম্ভাব্য বা চলমান মামলার বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তবে প্রথমে তিনি বলেন, শিশুদের ওপর কোনো ধরনের বেঁধে রাখা বা রাবার বুলেট ব্যবহার করা হয়নি। পরে তিনি ওই বক্তব্য সংশোধন করে শিশু শব্দের পরিবর্তে অল্প বয়সী শিশু শব্দ ব্যবহার করেন বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানায়। অন্যান্য সংস্থাগুলো বুধবার পর্যন্ত কোনো মন্তব্য দেয়নি।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, অনেককে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়, জিপ টাই দিয়ে বেঁধে গাড়ি থেকে টেনে বের করা হয় এবং অমানবিক পরিস্থিতিতে খাবার, পানি ও টয়লেট ব্যবহারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। আরও বলা হয়েছে, কিছু গাড়িতে লোকজন বসা অবস্থায় রাবার বুলেট ছোড়া হয় এবং ফ্ল্যাশ ব্যাঙ গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়।
আইডাহোতে জন্ম নেওয়া একজন নারী নাগরিক জানান, তিনিও আটক হওয়াদের মধ্যে ছিলেন। তার তিন বছর বয়সী সন্তান কর্মকর্তাদের নির্দেশে তার পকেট ধরে কাঁদতে থাকে। তিনি বলেন, পরিবারের আনন্দ ভ্রমণ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছিল। তার ভাষ্যে, তার ছোট সন্তানকে প্রিয়জনদের ওপর সহিংসতা দেখতে হয়েছে এবং লাতিনোদের নিয়ে বর্ণবাদী মন্তব্য শুনতে হয়েছে, যা কোনো শিশুর অভিজ্ঞতা হওয়া উচিত নয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাবার ও পানির জন্য সন্তানের আকুতি তার কাছে হৃদয়বিদারক ছিল। তিনি জানান, যা ঘটেছে তা অন্যায় এবং ভবিষ্যতে কোনো পরিবার যেন এমন আচরণের শিকার না হয়, সে কারণেই তিনি মামলায় যুক্ত হয়েছেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, অভিযানের পেছনে আংশিকভাবে অবৈধ জুয়ার অভিযোগের তদন্ত ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পৌঁছানোর পরপরই জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঁচজনকে আটক করা হয়। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, উপস্থিত জনতাকে অভিবাসন অবস্থার ধারণার ভিত্তিতে আলাদা দলে ভাগ করা হয় এবং বর্ণবাদী মন্তব্য করা হয়।
সংস্থাটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আটক ব্যক্তিদের মানুষ হিসেবে নয়, তার চেয়েও কম মর্যাদায় বিবেচনা করা হয়েছে। আইডাহো শাখার নির্বাহী পরিচালক এক বিবৃতিতে বলেন, এমন মুহূর্তে প্রশ্ন জাগে সমাজ হিসেবে আমরা কেমন হতে চাই। শিশু ও তাদের মায়েরা আজীবনের মানসিক আঘাত বহন করছে এবং একটি পারিবারিক পরিবেশকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, আটক ব্যক্তিদের একটি তাঁবুতে নিয়ে গিয়ে প্রত্যেককে তাদের অভিবাসন অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ উপস্থিতি প্রমাণ না করা পর্যন্ত কাউকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। অধিকাংশকে পরে ছেড়ে দেওয়া হলেও ১০৫ জনকে অভিবাসন লঙ্ঘনের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
নভেম্বরে এক ফেডারেল বিচারক ১৬ জন আটক ব্যক্তিকে মুক্তির নির্দেশ দেন। রায়ে বলা হয়, জামিন ছাড়াই তাদের আটক রাখা ন্যায়বিচারের অধিকার লঙ্ঘন করেছে। বিচারক নির্দেশ দেন, তাদের অভিবাসন সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মুক্ত রাখা হবে।







Add comment