পেরুর এক সাংবাদিক দম্পতি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর দাবি করেছেন, নিজ দেশে পেশাগত কাজের কারণে পাওয়া একাধিক প্রাণনাশের হুমকিই প্রমাণ করে যে তাদের জীবন প্রকৃত ঝুঁকির মধ্যে ছিল। তবে তাদের সর্বশেষ আশ্রয় আবেদন নাকচ হয়েছে। তাদের আইনজীবী ও একাধিক আইনি অধিকারকর্মীর মতে, এই সিদ্ধান্ত দেখিয়ে দেয় সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় অনুমোদনের হার কতটা কঠোরভাবে কমে গেছে।
দম্পতির স্বামী, যিনি লিমাভিত্তিক একটি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রযোজক হিসেবে কাজ করতেন, জানান ২০২২ সালের শেষ দিকে লিমায় নিজ বাসায় ডোরবেল বাজার পর দরজা খুলে তিনি দরজার সামনে একটি খাম দেখতে পান। দূরে একজন ব্যক্তিকে দৌড়ে পালাতে দেখেন তিনি। খামের ভেতরে থাকা চিঠিতে সরাসরি সতর্ক করা হয় যেন তারা দল ও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে সমালোচনামূলক মন্তব্য বন্ধ করেন, নতুবা তাদের এবং পরিবারের সদস্যদের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। চিঠিতে কোনো প্রেরকের ঠিকানা ছিল না। পরে আরেকটি খাম আসে, যার ভেতরে ছিল তিনটি গুলি।
ওই চ্যানেলে তিনি তার স্ত্রীর সঙ্গে কাজ করতেন। স্ত্রী ছিলেন একটি অনুষ্ঠানের উপস্থাপক এবং প্রশাসন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে প্রতিবেদন করতেন। অনুষ্ঠানটি সরাসরি রাজনৈতিক না হলেও, সাবেক প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতি ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ, যা শেষ পর্যন্ত তাকে ১১ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে, তা কভার করা হয়েছিল।
স্বামী জানান, হুমকির পর তাদের বাড়ির আশপাশে অপরিচিত লোকজন ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। নিজেদের নিরাপত্তাহীন মনে হওয়ায় তারা চাকরি ছেড়ে দেন এবং বিষয়টি পুলিশকে জানান। কিন্তু পেরুর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা না পেয়ে তারা দুই কন্যাসন্তানকে নিয়ে মেক্সিকোতে যান। সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে সীমান্ত অতিক্রম করলে তাদের বিরুদ্ধে বহিষ্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরবর্তীতে তারা আশ্রয় এবং নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের অধীনে সুরক্ষার আবেদন করেন।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন মামলার সর্বোচ্চ প্রশাসনিক সংস্থা বোর্ড অব ইমিগ্রেশন আপিলস তাদের আপিল খারিজ করে। বোর্ডের সিদ্ধান্তে বলা হয়, অস্পষ্ট, বেনামী বা কেবল ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে দেওয়া মৃত্যুহুমকি একাই নিপীড়নের পর্যায়ে পড়ে না।
টেক্সাসের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিগ্রেশন ক্লিনিকের পরিচালক এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। তার মতে, এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী কেবল সুপ্রতিষ্ঠিত মৃত্যুভয় যথেষ্ট নয়; অর্থাৎ গুরুতরভাবে আহত হওয়া বা প্রাণহানির শিকার হওয়ার আগ পর্যন্ত আশ্রয়ের যোগ্যতা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে সাংবাদিকদের জন্য লাতিন আমেরিকা এখনও সবচেয়ে প্রাণঘাতী অঞ্চল। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ২০২৫ সালেই ১৭ জন সাংবাদিক হত্যার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পেরুতে জাতীয় সাংবাদিক সমিতি গত বছরে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ৪৫৮টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে, যার মধ্যে তিনজন সাংবাদিক নিহত হন। ২০১৬ সালের পর এমন ঘটনা ঘটেনি, যদিও নব্বইয়ের দশকে সশস্ত্র সংঘাতের সময় এ ধরনের হামলা ছিল সাধারণ।
দম্পতির স্বামী বলেন, পেরুতে ফেরত গেলে তাদের ওপর হামলার আশঙ্কা রয়েছে। তার ভাষায়, আগে হুমকি দেওয়া হতো, এখন মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের আদালত বলছে, কেবল মৃত্যুহুমকি যথেষ্ট নয়।
২০২৪ সালে মিয়ামির একটি অভিবাসন আদালতে প্রথম তাদের মামলা শুনানি হয়। বিচারক স্বীকার করেন যে হুমকিগুলো সরকারবিরোধী সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে তিনি সিদ্ধান্ত দেন যে এগুলো অতীত নিপীড়নের মানদণ্ড পূরণ করে না এবং আবেদন নাকচ করেন।
দম্পতির আইনজীবী আপিলে যুক্তি দেন যে কিছু ফেডারেল আদালত নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মৃত্যুহুমকিকেই নিপীড়ন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু বোর্ড অপেক্ষাকৃত কঠোর ব্যাখ্যা গ্রহণ করে জানায়, হামলাকারীর তাৎক্ষণিকভাবে হুমকি বাস্তবায়নের সক্ষমতার প্রমাণ না থাকলে এমন হুমকি খুব কম ক্ষেত্রেই নিপীড়ন হিসেবে গণ্য হবে।
আইনজীবীর মতে, এই রায় ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলাকে আরও কঠিন করে তুলবে। ইতোমধ্যে তিনি ১১তম সার্কিট আপিল আদালতে পুনর্বিবেচনার আবেদন করছেন।
সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্টে মাসিক আশ্রয় অনুমোদনের হার নেমে আসে ১৯.২ শতাংশে, যা ২০২৪ সালের একই সময়ে ছিল ৩৮.২ শতাংশ। কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ অর্থবছরে বার্ষিক অনুমোদনের হার মাত্র ১২ শতাংশ হতে পারে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আদালতগুলোতে ৩৭ লাখের বেশি মামলা ঝুলে আছে। নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবার পরিচালক গত নভেম্বরে ঘোষণা দেন, বিদেশি নাগরিকদের পূর্ণাঙ্গ যাচাই নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সব আশ্রয় সিদ্ধান্ত স্থগিত থাকবে।
ম্যাসাচুসেটসভিত্তিক এক অভিবাসন আইনজীবী বলেন, সাধারণত হুমকি পাওয়া ব্যক্তিরা অপেক্ষা করে না; তারা কর্তৃপক্ষের কাছে যায় এবং সুরক্ষা না পেলে দেশত্যাগ করে। তার মতে, অনুরূপ হুমকি পেয়ে যারা পরে নিহত হয়েছেন, সেই প্রেক্ষাপটে হুমকির বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য অপেক্ষা করা বাস্তবসম্মত নয়। এই সিদ্ধান্ত আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য কঠোর বার্তা বহন করছে এবং নিজ দেশে নিরাপদে ফিরতে অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য পথ আরও সংকুচিত করছে।







Add comment