Bp News USA

স্টারমারের চাপের সামনে শাবানা?

যুক্তরাষ্ট্রে এপস্টিন–সম্পর্কিত নথি প্রকাশের জেরে যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার রেশ এখন ওয়েস্টমিনস্টারের কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রধানমন্ত্রী যখন তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম কঠিন সময় পার করছেন, তখন ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ভেতরে সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়ে নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু হয়েছে। সেই আলোচনায় দ্রুত উচ্চারিত হচ্ছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম। দলীয় নেতৃত্বে পরিবর্তন এলে তিনিই হতে পারেন নতুন মুখ, আর তা হলে যুক্তরাজ্য পেতে পারে ইতিহাসের প্রথম মুসলিম প্রধানমন্ত্রী।

সংকটের প্রেক্ষাপট

ওয়াশিংটনে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত হিসেবে এক জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নিয়োগ ঘিরে বিতর্ক থেকেই মূলত পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়। নিউইয়র্কের কারাগারে ২০১৯ সালে মারা যাওয়া কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে ওই কূটনীতিকের অতীত সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় আসায় সরকারের ভেতরেই অস্বস্তি বাড়ে। বিষয়টি সামনে আসার পর লেবার পার্টির ভেতরে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

এই নিয়োগের দায় স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রীর চিফ অব স্টাফ পদত্যাগ করেন। প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান রক্ষার কৌশল হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এতে সরকারের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। জনমত জরিপে সমর্থন কমতে থাকায় দলীয় অনেক নীতিনির্ধারক ব্যক্তিগত আলোচনায় বলছেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত, পরিস্থিতি প্রায় সমান সম্ভাবনার জায়গায় দাঁড়িয়ে।

আলোচনার কেন্দ্রে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

এমন বাস্তবতায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ঘিরে জল্পনা বাড়ছে। তিনি ২০২৫ সাল থেকে এ দায়িত্ব পালন করছেন এবং প্রধানমন্ত্রীের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। দলীয় অন্দরে তাঁকে শৃঙ্খলাপরায়ণ, বাগ্মী ও সংগঠক হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা শুরু হলে তিনি অন্যতম শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

৪৫ বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদ বার্মিংহামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পারিবারিক শিকড় পাকিস্তান ও পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীরের মিরপুর অঞ্চলে। অক্সফোর্ডের লিঙ্কন কলেজ থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর ‘বার ভোকেশনাল কোর্স’ সম্পন্ন করে ব্যারিস্টার হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন। আইনি পটভূমি তাঁকে নীতিগত অবস্থানে দৃঢ় ও সংগঠনে দক্ষ হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে।

২০১০ সালে প্রথমবারের মতো তিনি পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন। রুশনারা আলী ও ইয়াসমিন কোরেশির পাশাপাশি তিনিও ছিলেন যুক্তরাজ্যের প্রথম দিককার মুসলিম নারী এমপিদের একজন। প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

অভিবাসন নীতিতে কঠোর অবস্থান

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর সীমান্ত নিরাপত্তা, পুলিশ প্রশাসন ও অভিবাসন নীতিতে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে স্থায়ী বসবাসের আবেদন প্রক্রিয়ায় সময়সীমা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার প্রস্তাব দিয়ে তিনি কঠোর অবস্থানের পরিচয় দেন। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস কোনো অধিকার নয়, বরং একটি বিশেষ সুযোগ।

তিনি মনে করেন, জনগণের আস্থা পুনর্গঠনে এমন পদক্ষেপ প্রয়োজন। তবে এই অবস্থান লেবার পার্টির ভেতরের একটি অংশ ও অভিবাসন–অধিকার সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মধ্যে বিতর্ক তৈরি করেছে। একদিকে গাজা যুদ্ধ ইস্যুতে দলবিমুখ হওয়া মুসলিম ও ফিলিস্তিনপন্থী ভোটারদের কাছে তিনি গ্রহণযোগ্য হতে পারেন বলে কেউ কেউ মনে করেন। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তাঁর কঠোর নীতিকে অনেকে মধ্যপন্থী বা রক্ষণশীল ঘরানার রাজনীতি হিসেবে দেখছেন। এই দ্বৈত বৈশিষ্ট্য তাঁকে একই সঙ্গে সম্ভাবনাময় ও বিতর্কিত করে তুলেছে।

নেতৃত্বের অঙ্ক

বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু করতে অন্তত ৮১ জন লেবার এমপির সমর্থন প্রয়োজন। এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো চ্যালেঞ্জ ঘোষণা হয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান আরও দুর্বল হলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে বলে দলীয় সূত্রে ধারণা করা হচ্ছে।

আলোচনায় আরও নাম

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নাম সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে ঘুরছে। ৪৩ বছর বয়সী এই মন্ত্রীকে দক্ষ বক্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গাজা যুদ্ধসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তিনি সরকারের অন্যতম মুখপাত্র। অতীতে তাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে গুঞ্জন শোনা গেলেও তিনি সেসবকে গুরুত্ব দেননি।

সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রীও আলোচনায় রয়েছেন। তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই রাজনীতিক অল্প বয়সে সংসদ সদস্য হন এবং পরে দলের উপনেতার দায়িত্ব পালন করেন। বাড়ি কেনা–সংক্রান্ত কর বিতর্কে পদত্যাগ করায় তাঁর অবস্থান কিছুটা দুর্বল হলেও সাম্প্রতিক সংকটে বিদ্রোহী এমপিদের নেতৃত্ব দেওয়ায় আবারও তাঁর নাম সামনে এসেছে।

গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র দীর্ঘদিন ধরেই সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত। অতীতে সংস্কৃতি ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা এই অভিজ্ঞ রাজনীতিকের সামনে সাংবিধানিক বাধা রয়েছে, কারণ প্রধানমন্ত্রী হতে হলে বর্তমান এমপি হওয়া বাধ্যতামূলক। সাম্প্রতিক উপনির্বাচনে প্রার্থী হতে না পারায় তাঁর সম্ভাবনা কমেছে।

জ্বালানিমন্ত্রীও আলোচনার তালিকায় আছেন। তিনি আগে লেবার পার্টির প্রধান ছিলেন এবং ২০১৫ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর নেতৃত্ব ছাড়েন। পুনরায় নেতৃত্বে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ না করলেও তাঁর অভিজ্ঞতা ও নীতিনির্ধারণী দক্ষতা সংকটকালে তাঁকে প্রাসঙ্গিক করে তুলছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতার এই সময়ে লেবার পার্টির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে হিসাব–নিকাশ চলছেই। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান কতটা স্থিতিশীল থাকে তার ওপর। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, নেতৃত্বে পরিবর্তন এলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed