ইন্ট্রোভার্ট ও এক্সট্রোভার্ট শব্দ দুটি আমাদের কাছে বেশ পরিচিত। সাধারণত মানুষ নিজের স্বভাব বোঝাতে এই দুই ধরনের যেকোনো একটির সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নেন। তবে ব্যক্তিত্বের এই দুই চরমের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা আরেক ধরনের মানুষও আছেন, যাঁদের বলা হয় অন্ট্রোভার্ট। মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এই স্বভাবকে আলাদা করে দেখা হয়, কারণ তাঁদের আচরণ ও চিন্তাভাবনা প্রচলিত ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
একজন অন্ট্রোভার্ট মানুষের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু থাকে নিজের ভেতরে। নিজের ভাবনা, অনুভূতি ও বিশ্লেষণই তাঁদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটিকে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অন্ট্রোভার্টরা সামাজিক যোগাযোগ এড়িয়ে চলেন না; বরং অর্থপূর্ণ ও গভীর সম্পর্ক স্থাপনে বেশি আগ্রহী হন। অকারণ আড্ডা বা হালকা কথাবার্তার চেয়ে তাঁরা গুরুত্ব দেন গঠনমূলক আলোচনা ও মানসম্মত যোগাযোগে।
অনেকে অন্ট্রোভার্ট মানুষকে চুপচাপ বা নিরব বলে চিহ্নিত করেন। বাস্তবে এই চুপ থাকা মানুষের প্রতি অনীহার প্রকাশ নয়। বরং কখন কথা বলা প্রয়োজন এবং কখন নীরব থাকা উচিত, সে সিদ্ধান্ত তাঁরা সচেতনভাবেই নেন। কথার চেয়ে শোনার গুরুত্ব তাঁদের কাছে বেশি। অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন, পর্যবেক্ষণ করেন এবং সেখান থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও অনুভূতি বুঝে নেন।
চিন্তার গভীরতা অন্ট্রোভার্টদের একটি বড় বৈশিষ্ট্য। তাঁরা কোনো বিষয়কে হালকাভাবে দেখেন না। বরং প্রতিটি বিষয় বিশ্লেষণ করেন ধীরে এবং গুরুত্ব দিয়ে। এলোমেলো ভাবনায় সময় নষ্ট না করে অর্থপূর্ণ চিন্তায় ডুবে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাঁদের কল্পনাশক্তিও বেশ প্রবল হয়। একই সঙ্গে বাস্তবতার নিরিখে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা তাঁদের আলাদা করে চিহ্নিত করে।
নিজেকে অন্যের মনোযোগের কেন্দ্রে রাখার জন্য অন্ট্রোভার্টরা সচেতন কোনো প্রচেষ্টা করেন না। তবে কেউ যদি তাঁদের প্রতি মনোযোগ দেন, সেটিও তাঁদের অপছন্দের বিষয় নয়। তবু তুচ্ছ বিষয় বা অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তায় তাঁরা দ্রুত বিরক্ত হয়ে পড়তে পারেন। কখনো কখনো অল্পতেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ার প্রবণতাও দেখা যায়, যা তাঁদের সংবেদনশীল মানসিকতারই প্রকাশ।
ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একজন অন্ট্রোভার্ট সাধারণত সততার দিক থেকে দৃঢ় অবস্থানে থাকেন। গভীরভাবে চিন্তা করার অভ্যাস থাকার কারণে এক মুহূর্তের ভুলে সম্পর্ক নষ্ট করার আশঙ্কা তুলনামূলক কম থাকে। বিশ্বাস ভাঙার প্রবণতা তাঁদের মধ্যে খুব একটা দেখা যায় না। তবে ভালোবাসা প্রকাশের ধরন অনেক সময় প্রচলিত রীতির সঙ্গে মেলে না।
সঙ্গীর কথা মন দিয়ে শোনা অন্ট্রোভার্টদের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। সরাসরি কথায় আবেগ প্রকাশ না করলেও তাঁদের কাজকর্ম ও আচরণে সঙ্গীর গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সম্পর্কের আবেগঘন দিকগুলো তাঁরা গভীরভাবে অনুভব করেন এবং ভেতরে ভেতরে তা লালন করেন।
তবে ভালোবাসার প্রকাশ তুলনামূলক কম হওয়ায় অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে একজন অন্ট্রোভার্টের জন্য এমন সঙ্গী গুরুত্বপূর্ণ, যিনি তাঁর নীরবতা ও একান্ত সময় কাটানোর প্রবণতাকে সহজভাবে গ্রহণ করবেন এবং সম্মান জানাবেন।
কর্মক্ষেত্রে অন্ট্রোভার্ট মানুষ সাধারণত সৃজনশীলতার পরিচয় দেন। গবেষণামূলক কাজ, লেখালেখি, ডিজাইন বা নীতিমালা প্রণয়নের মতো কাজে তাঁরা দক্ষ হয়ে ওঠেন। গভীর মনোযোগ ও বিশ্লেষণ ক্ষমতার কারণে জটিল সমস্যা সমাধানেও তাঁদের অবদান উল্লেখযোগ্য।
নেতৃত্বের গুণাবলিও অন্ট্রোভার্টদের মধ্যে বিদ্যমান। তবে সেই নেতৃত্ব যদি সব সময় মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগনির্ভর হয়, তাহলে তাঁরা কিছুটা অস্বস্তি বোধ করতে পারেন। অনেকের ধারণা, অন্ট্রোভার্ট মানুষ সামাজিকতা এড়িয়ে চলেন বা তাঁরা লাজুক প্রকৃতির। এই ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আত্মবিশ্বাসের দিক থেকে অন্ট্রোভার্টরা মোটেও পিছিয়ে নন। বরং পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা দৃঢ় অবস্থান নেন। নিজের দর্শন ও মূল্যবোধ তাঁদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাজের দক্ষতা ও পেশাগত নিষ্ঠা তাঁদের ব্যক্তিত্বকে আলাদা মাত্রা দেয়।
সব মিলিয়ে, অন্ট্রোভার্ট স্বভাব কোনো সীমাবদ্ধতা নয়; বরং এটি এক ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্বের প্রকাশ, যেখানে নীরবতা, গভীরতা ও আত্মবিশ্বাস একসঙ্গে কাজ করে।







Add comment