দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহের বিচ্ছিন্নতার পর অবশেষে মঙ্গলগ্রহে অবস্থানরত কিউরিওসিটি রোভারের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ স্থাপন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা। পৃথিবীর সঙ্গে সংযোগ পুনরুদ্ধারের পরপরই রোভারটি তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক কার্যক্রম শুরু করেছে। মঙ্গলগ্রহে অতীতের জীবনের সম্ভাব্য চিহ্ন খুঁজে বের করতে বিশেষ রাসায়নিক পরীক্ষা চালানো হচ্ছে, যার লক্ষ্য গ্রহটির শিলার গভীরে লুকিয়ে থাকা জৈব অণুর সন্ধান পাওয়া।
মহাকাশ সংস্থার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরি জানায়, গত জানুয়ারিতে সূর্য পৃথিবী ও মঙ্গলের মাঝামাঝি অবস্থানে চলে এলে সৃষ্টি হয় সোলার কনজাংশন। এ সময় সূর্যের তীব্র বিকিরণের কারণে দুই গ্রহের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়। ফলে কিউরিওসিটির সঙ্গে সব ধরনের বার্তা আদান-প্রদান বন্ধ হয়ে যায়। সম্প্রতি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবারও যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হয় এবং রোভারটি তার নির্ধারিত বৈজ্ঞানিক মিশনে ফিরে আসে।
সংযোগ পুনরুদ্ধারের পর কিউরিওসিটি তার পরবর্তী গন্তব্য ‘নেভাডো সাজামা’ নামের একটি শিলাখণ্ডের কাছে পৌঁছেছে। বর্তমানে সেখানে অবস্থান করেই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা পরিচালনা করছে রোবটটি। এ পরীক্ষাটি মূলত ওয়েট কেমিস্ট্রি পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে। রোভারটিতে এ ধরনের পরীক্ষার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল মোট নয়টি পাত্র। এর মধ্যে আটটি ইতোমধ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। এখন অবশিষ্ট শেষ পাত্রটি কাজে লাগিয়ে চালানো হচ্ছে এই চূড়ান্ত পরীক্ষা।
পরীক্ষার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে টেট্রামিথাইল অ্যামোনিয়াম হাইড্রক্সাইড নামের একটি বিশেষ রাসায়নিক দ্রবণ। প্রথমে মঙ্গলের শিলা গুঁড়া করে সেই নমুনার সঙ্গে দ্রবণটি মেশানো হবে। এরপর নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় তা উত্তপ্ত করা হবে। যদি শিলার মধ্যে প্রাচীন জৈব অণু কিংবা জীবনের কোনো রাসায়নিক চিহ্ন থেকে থাকে, তাহলে এই প্রক্রিয়ায় তা শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। যেহেতু এটি রোভারটির কাছে থাকা শেষ পাত্র এবং শেষ সুযোগ, তাই সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা কোনো ঝুঁকি নিতে চাননি। কয়েক মাস ধরে পৃথিবীতে একই পদ্ধতির মহড়া ও পরীক্ষামূলক অনুশীলন চালিয়ে তারা পুরো প্রক্রিয়াটি নিশ্চিত করেছেন।
বর্তমানে কিউরিওসিটি গেইল ক্রেটারের ‘বক্সওয়ার্ক’ নামে পরিচিত একটি অঞ্চলে অবস্থান করছে। এ এলাকার শিলাগুলো মূলত পলিজমা থেকে তৈরি। ধারণা করা হয়, কোটি কোটি বছর আগে সেখানে পানির উপস্থিতিতে এসব শিলা গঠিত হয়েছিল। বিজ্ঞানীদের মতে, কোনো অঞ্চলে যদি অতীতে দীর্ঘ সময় পানি থাকে, তাহলে সেখানে অণুজীবের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সেই কারণেই এই অঞ্চলকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
গত বছরের নভেম্বর মাসেও একই এলাকার কাছাকাছি একটি স্থানে ছিদ্র করে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল। তখন কিছু আশাব্যঞ্জক খনিজ উপাদানের সন্ধান পাওয়া যায়, যা গবেষকদের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেয়। সেই প্রেক্ষাপটেই বর্তমান পরীক্ষা বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। গবেষকরা আশা করছেন, নতুন এই রাসায়নিক বিশ্লেষণ মঙ্গলগ্রহের অতীত পরিবেশ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা দিতে সক্ষম হবে।
তবে পরীক্ষার ফলাফল হাতে পেতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। বিশ্লেষণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে চূড়ান্ত তথ্য পেতে কয়েক মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে জানা গেছে। যদি সত্যিই জটিল জৈব অণুর উপস্থিতি শনাক্ত হয়, তাহলে তা মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হবে। এমন আবিষ্কার মানবজাতির মহাবিশ্বে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে ধারণাকে নতুনভাবে আলোচিত করবে এবং ভবিষ্যৎ অনুসন্ধান কার্যক্রমে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।







Add comment