যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আইন প্রয়োগকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে যে কৌশলগত দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল, তার একটি স্পষ্ট চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক একটি অভ্যন্তরীণ ইমেইলে। শিকাগোতে অভিবাসনবিরোধী অভিযানের ধরন নিয়ে কেন্দ্রীয় নির্দেশনার সঙ্গে একমত হতে পারেননি বর্ডার প্যাট্রোলের তৎকালীন শীর্ষ এক কর্মকর্তা। এই মতানৈক্য তৈরি হয় মিনিয়াপোলিসে বর্ডার প্যাট্রোল সদস্যদের হাতে দুই ব্যক্তির প্রাণঘাতী গুলির ঘটনার কয়েক মাস আগেই।
ওয়াশিংটনে প্রাপ্ত ইমেইল অনুযায়ী, শিকাগোতে সেপ্টেম্বর মাসে পরিচালিত একটি অভিযানে ব্যাপক পরিসরে ধরপাকড় চালাতে আগ্রহী ছিলেন বর্ডার প্যাট্রোলের তৎকালীন কমান্ডার। তবে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থার ভারপ্রাপ্ত প্রধান তাকে জানান, ওই অভিযানের মূল লক্ষ্য হবে সীমিত ও নির্দিষ্ট অভিযান। অর্থাৎ যেসব ব্যক্তি আগেই ফেডারেল কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে ছিলেন এবং অভিবাসন আইন বা অন্য কোনো আইন ভঙ্গের অভিযোগে চিহ্নিত ছিলেন, কেবল তাদেরই গ্রেপ্তার করা হবে।
ইমেইলে ওই কর্মকর্তা লেখেন, সংস্থার ভারপ্রাপ্ত প্রধান অন্তত দুই সপ্তাহ ধরে সীমিত লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান চালানোর ওপর জোর দেন, এরপর পূর্ণমাত্রার অভিবাসন আইন প্রয়োগে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং এরপর আলোচনা কার্যত শেষ হয়ে যায় বলে ইমেইলে উল্লেখ করা হয়।
তবে পরিস্থিতি পরে কিছুটা বদলায়। শিকাগোতে প্রায় ১০ দিন সীমিত অভিযানের পর স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের শীর্ষ নেতৃত্ব ওই কর্মকর্তাকে আরও আক্রমণাত্মক কৌশল ব্যবহারের অনুমতি দেয়। এরপর তার তত্ত্বাবধানে থাকা বর্ডার প্যাট্রোল সদস্যরা এমন ব্যক্তিদের থামাতে শুরু করেন, যাদের তারা অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন বলে সন্দেহ করেন। এসব ব্যক্তির পরিচয় অনেক ক্ষেত্রেই আগে থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে জানা ছিল না।
এই অভিযানটি পরে ‘অপারেশন মিডওয়ে ব্লিটজ’ নামে পরিচিতি পায়। অভিযানে প্রায় ১ হাজার ৬০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। শিকাগো ও আশপাশের এলাকায় এ সময় বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঘটনা ঘটে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। অভিযানের সময় অভিবাসন কর্মকর্তাদের গুলিতে দুই ব্যক্তি আহত হন।
ইমেইলটি ট্রাম্প প্রশাসনের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা টিমের ভেতরের উত্তেজনাকেই সামনে আনে। প্রেসিডেন্টের ব্যাপক আকারের বহিষ্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তার সহযোগীরা একাধিক কৌশলগত সমস্যার মুখে পড়েছেন। বর্ডার প্যাট্রোলের ওই কর্মকর্তার কঠোর পদ্ধতি ইতোমধ্যে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। শিকাগোতে অভিবাসন গ্রেপ্তার নিয়ে একটি মামলাও দায়ের হয়েছে। মিনিয়াপোলিসে আইসিইউ নার্স ও তিন সন্তানের এক মায়ের প্রাণঘাতী গুলির ঘটনার পর গত সপ্তাহে তাকে তার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
ইমেইলে দেখা যায়, ওই কর্মকর্তা স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা সচিবের ঘনিষ্ঠ শীর্ষ এক উপদেষ্টার সঙ্গে নিজেকে একই অবস্থানে দেখছিলেন। তিনি দাবি করেন, অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থার প্রধান তাকে কর্তৃত্ব দেখাতে চাইলে তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে তিনি ওই উপদেষ্টার কাছে রিপোর্ট করেন। ওই উপদেষ্টা গত ফেব্রুয়ারি থেকে বিনা বেতনে বিশেষ সরকারি কর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এই বক্তব্য স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা সচিবের আগের প্রকাশ্য মন্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, সব অভিবাসন অভিযানই নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক এবং আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধেই পরিচালিত হয়।
বাস্তবে দেখা গেছে, ওই কর্মকর্তা এমন অভিযান তদারকি করেছেন যেখানে নির্দিষ্ট স্থানের ভিত্তিতে লোকজনকে থামানো হয়েছে। যেমন, একটি হার্ডওয়্যার দোকানের পার্কিং লটে দিনমজুরদের একটি দলকে থামানো হয় এবং পরিচয় যাচাই করা হয়, যদিও তাদের বিরুদ্ধে আগাম কোনো তথ্য ছিল না।
এ বিষয়ে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা, স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ এবং কাস্টমস ও বর্ডার প্রোটেকশন কর্তৃপক্ষের মুখপাত্ররা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
চলতি সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট মিনিয়াপোলিস থেকে ওই কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করে তার বর্ডার প্যাট্রোল কমান্ডারের পদবি প্রত্যাহার করেন। তাকে ক্যালিফোর্নিয়ার এল সেন্ট্রো অঞ্চলের সেক্টর প্রধান হিসেবে আগের পদে ফেরত পাঠানো হয়। তার জায়গায় মিনিয়াপোলিসে পাঠানো হয় সীমান্ত বিষয়ক বিশেষ দূতকে।
এই পরিবর্তন এসেছে তার কৌশল ও জনসমক্ষে দেওয়া বক্তব্য নিয়ে ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মধ্যেই, যা ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতিকে ঘিরে অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।






Add comment