নেদারল্যান্ডসের মর্যাদাপূর্ণ রটারড্যাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকে বড় স্বীকৃতি পেল বাংলাদেশের সিনেমা ‘মাস্টার’। উৎসবের ‘বিগ স্ক্রিন কমপিটিশন’ বিভাগে অংশ নিয়ে শীর্ষ পুরস্কার অর্জন করেছে ছবিটি। শুক্রবার রাতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের সিনেমার জন্য এটি একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
‘মাস্টার’ এই বিভাগে নির্বাচিত ১২টি চলচ্চিত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে পুরস্কারটি লাভ করে। ছবিটি পরিচালনা করেছেন একজন বাংলাদেশি নির্মাতা, যিনি এর আগেও ভিন্নধর্মী কাজের জন্য পরিচিত। আন্তর্জাতিক উৎসবের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পুরস্কার পাওয়া দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
পুরস্কার ঘোষণার পরপরই ছবিটির টিমের মধ্যে আনন্দের আবহ তৈরি হয়। ছবির অন্যতম অভিনয়শিল্পী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক প্রতিক্রিয়ায় এই সাফল্যকে পুরো টিমের সম্মিলিত অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বাংলাদেশের জন্য দিনটিকে গর্বের বলে অভিহিত করেন। অনুষ্ঠানে পরিচালকের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে ছবির পরিচালক একটি জাতীয় দৈনিককে জানান, এই স্বীকৃতি তাঁদের জন্য অনেক বড় সম্মান। তাঁর ভাষায়, এই বিভাগের প্রতিযোগী তালিকায় ছিল বিশ্বের নানা প্রান্তের মানসম্মত চলচ্চিত্র। সেখানে জায়গা পাওয়াটাই তাঁদের কাছে আনন্দের ছিল, আর সেখান থেকে পুরস্কার অর্জন করাটা স্বপ্নের মতো অনুভূতি তৈরি করেছে।
‘মাস্টার’ সিনেমার গল্প আবর্তিত হয়েছে একজন শিক্ষকের জীবনঘনিষ্ঠ বাস্তবতা নিয়ে। সময়ের প্রয়োজনে তিনি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন। নির্বাচনের আগে যাঁরা তাঁকে সমর্থন দিয়েছেন, সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করেছেন, নির্বাচনের পর তাঁদের অনেকেই তাঁর কাছ থেকে অন্যায্য সুবিধা প্রত্যাশা করতে শুরু করেন। এই প্রত্যাশাগুলো উপেক্ষা করাও তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় না, আবার নিজের নৈতিকতা ও বিবেক তাঁকে সেসব করতে বাধা দেয়। এই টানাপোড়েন ও দ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে তাঁকে বদলে দেয়। ক্ষমতা, দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত আদর্শের সংঘাতকে কেন্দ্র করেই এগিয়েছে সিনেমার মূল গল্প।
জুরি বোর্ড সিনেমাটিকে পুরস্কারের জন্য নির্বাচনের পেছনে যুক্তি হিসেবে জানিয়েছে, ‘মাস্টার’ মূলত একজন মানুষের নৈতিক অবস্থান ধরে রাখার সংগ্রামের কাহিনি। ক্ষমতা ও পুঁজিবাদের প্রলোভন কীভাবে ধীরে ধীরে একজন আদর্শবাদী মানুষকে পরিবর্তিত করে, তা ছবিতে সূক্ষ্ম ও বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। চিত্রায়নে শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল, জীবন্ত লোকেশন এবং বিশ্বাসযোগ্য পার্শ্বচরিত্র গল্পকে আরও গভীরতা দিয়েছে। প্রধান অভিনেতার অভিনয় চরিত্রটির ভেতরের দ্বন্দ্বকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। সব মিলিয়ে সিনেমাটি ক্ষমতার সর্বগ্রাসী প্রভাবকে উন্মোচন করে।
গত ২ ফেব্রুয়ারি রটারড্যামে ‘মাস্টার’-এর ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়। প্রদর্শনের পরপরই আন্তর্জাতিক দর্শক ও সমালোচকদের মধ্যে ছবিটি ইতিবাচক সাড়া ফেলে। প্রিমিয়ারের সময় পরিচালকের সঙ্গে উৎসবে উপস্থিত ছিলেন ছবির তিন অভিনয়শিল্পী, যাঁরা তাঁদের অভিনয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।
প্রিমিয়ারের আগেই যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে যুক্ত হওয়ায় ছবিটি আন্তর্জাতিকভাবে বাড়তি আলোচনায় আসে। এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছেন বিশ্বখ্যাত এক চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বের উত্তরসূরি ও একজন অভিজ্ঞ প্রযোজক। তাঁদের সম্পৃক্ততা ছবিটির আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়িয়েছে।
সিনেমাটিতে আরও অভিনয় করেছেন দেশের পরিচিত কয়েকজন অভিনেতা। গল্প, চিত্রনাট্য, পরিচালনা এবং প্রযোজনার দায়িত্ব একাই সামলেছেন পরিচালক নিজে। গত ২৯ জানুয়ারি শুরু হওয়া রটারড্যাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব আগামীকাল শেষ হবে। উল্লেখ্য, এই উৎসবের সর্বোচ্চ সম্মান হিসেবে বিবেচিত ‘টাইগার অ্যাওয়ার্ড’ এবছর পেয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার একটি সিনেমা, যা যৌথভাবে পরিচালনা করেছেন দুই নির্মাতা।
বাংলাদেশি সিনেমা ‘মাস্টার’-এর এই অর্জন আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের চলচ্চিত্রের সম্ভাবনাকে নতুনভাবে তুলে ধরেছে এবং ভবিষ্যতে আরও এমন সাফল্যের পথ তৈরি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।







Add comment