Bp News USA

ট্রাম্প সমর্থনেও ধাক্কায় বিটকয়েন বাজার

বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত ও বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েনের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। সাম্প্রতিক দরপতনের ফলে বিটকয়েন এখন গত ১৫ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে অবস্থান করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ও প্রকাশ্য সমর্থন, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে ক্রিপ্টোবান্ধব নীতির ঘোষণা সত্ত্বেও বাজারে এই পতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বর্তমানে একটি বিটকয়েনের বাজারমূল্য প্রায় ৬৬ হাজার মার্কিন ডলার। এটি ২০২৪ সালের অক্টোবরের পর সর্বনিম্ন দাম। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিটকয়েনের দাম কমেছে প্রায় ২৪ শতাংশ। অথচ এর আগের কয়েক মাসে এই ডিজিটাল মুদ্রার দামে বড় ধরনের উত্থান দেখা গিয়েছিল। সেই ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতির ফলেই গত বছরের অক্টোবরে বিটকয়েন ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১ লাখ ২২ হাজার ২০০ ডলারে পৌঁছায়।

গত বৃহস্পতিবার সর্বশেষ বড় দরপতনের পর হিসাব করলে দেখা যায়, গত এক বছরে বিটকয়েনের দাম কমেছে প্রায় ৩২ শতাংশ। দাম এখন ধীরে ধীরে ২০২৪ সালের শুরু এবং ২০২১ সালের দামের কাছাকাছি স্তরে নেমে আসছে। বিটকয়েন একটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল মুদ্রা, যা কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা আর্থিক কর্তৃপক্ষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নেই। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই এটি একদিকে যেমন জনপ্রিয়, অন্যদিকে তেমনই ঝুঁকিপূর্ণ।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি সম্পৃক্ততা এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতি তাঁর প্রকাশ্য সমর্থনের কারণে একসময় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় ধরনের আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। তিনি এই খাতে নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার প্রতিশ্রুতি দেন, যার প্রভাবে বিটকয়েনের দাম দ্রুত বেড়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর তাঁর প্রশাসনের শুরুতেই একটি নির্বাহী আদেশ দেওয়া হয়, যার লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের ‘ক্রিপ্টো রাজধানী’ হিসেবে গড়ে তোলা।

এর পাশাপাশি দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজের নামে একটি ব্যক্তিগত ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্র্যান্ড চালু করেন। এই উদ্যোগ থেকে অর্জিত মুনাফার বড় অংশ যায় তাঁর নিজস্ব কোম্পানিগুলোর কাছে। একই সঙ্গে তিনি ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্সিয়াল’ নামের একটি বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, যা বিভিন্ন ক্রিপ্টো সম্পদে বিনিয়োগ করে এবং এটি প্রেসিডেন্ট পরিবারের মালিকানাধীন।

ক্রিপ্টোকারেন্সিতে ফেডারেল পর্যায়ের সমর্থন জোরদার করতে প্রেসিডেন্ট একটি আইনে স্বাক্ষর করেন। ক্রিপ্টো নিয়ন্ত্রণ বাস্তবায়নে কাজ করা বিচার বিভাগের একটি বিশেষ দল ভেঙে দেওয়া হয়। এমনকি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও ক্রিপ্টোসংক্রান্ত একাধিক তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ প্রত্যাহার করে নেয়। এসব পদক্ষেপের মধ্যেও বাজারে আস্থা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।

গত নভেম্বরে সিনেট জুডিশিয়ারি কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্যরা প্রেসিডেন্টের প্রো ক্রিপ্টো নীতির সমালোচনা করেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্রিপ্টো সম্পদের মোট মূল্য ১১ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ক্রিপ্টো লেনদেন থেকে ব্যক্তিগতভাবে তাঁর আয় হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি ডলার।

দাম কি আবার বাড়বে, এই প্রশ্ন এখন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত। বিশ্লেষকদের মতে, বিটকয়েনের দাম স্বভাবগতভাবেই অস্থির। ডয়চে ব্যাংকের বিশ্লেষকেরা এক প্রতিবেদনে বলেন, সাম্প্রতিক দরপতনের অন্যতম কারণ হলো ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে একজন তুলনামূলক কড়াকড়ি নীতির সমর্থককে মনোনয়ন দেওয়া। বাজারের ধারণা, তিনি সুদের হার তুলনামূলকভাবে বেশি রাখার পক্ষে থাকবেন। সাধারণত শিথিল মুদ্রানীতি ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে বিনিয়োগকে সহায়তা করে।

ডয়চে ব্যাংক আরও জানায়, গত চার মাস ধরেই বিটকয়েনের দাম নিম্নমুখী এবং সামগ্রিকভাবে ক্রিপ্টো বাজার নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব বাড়ছে। ধারাবাহিক এই বিক্রি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ঐতিহ্যবাহী বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে আগ্রহ হারাচ্ছেন। তবে ব্যাংকটি মনে করে না যে ক্রিপ্টোকারেন্সি পুরোপুরি হারিয়ে যাবে। তাদের মতে, বিটকয়েন এখন জল্পনাভিত্তিক সম্পদ থেকে সরে এসে একটি বাস্তবসম্মত অবস্থানে যাচ্ছে, যেখানে তাকে নিজের ভূমিকা নির্ধারণ করতে হবে।

একটি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী মনে করেন, ক্রিপ্টোকারেন্সি ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে দাম ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাঁর মতে, বিটকয়েনের দামে বড় ওঠানামা এই প্রথম নয়। তবে বড় কোনো বৈশ্বিক সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

বিটকয়েনের পাশাপাশি ইথেরিয়াম ও সোলানার মতো জনপ্রিয় অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সির দামও চলতি বছরে প্রায় ৩৭ শতাংশ কমেছে। বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কয়েনগেকোর তথ্য অনুযায়ী, শুধু গত এক মাসেই ক্রিপ্টো বাজার থেকে হারিয়ে গেছে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্য। আর গত অক্টোবরে বাজার চূড়ায় পৌঁছানোর পর থেকে মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি বিনিয়োগ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাদের বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে পাঠানো নোটে জানিয়েছে, বিটকয়েনের দাম আরও কমে ৩৮ হাজার ডলারে নামতে পারে। তাদের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, ক্রিপ্টোকারেন্সির দামের ওঠানামা এখন ক্রমেই মার্কিন ডলারের গতিবিধির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে পড়ছে। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে মার্কিন ডলারের মূল্য নেমে গিয়েছিল গত চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed