পত্রিকার পাতা বা লিংকডইন খুললেই চোখে পড়ে একই ধরনের বিজ্ঞাপন। এন্ট্রি লেভেল, ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েট কিংবা শূন্য থেকে তিন বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত। অথচ অনেক পেশাজীবীর বয়স ইতিমধ্যে ৪৫ বা ৫০ ছুঁয়েছে, অভিজ্ঞতা ২০ থেকে ২৫ বছরের বেশি। তবু বাস্তবতা হলো, এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতাই যেন আজ চাকরির বাজারে বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অবসর নেওয়ার সময় এখনো আসেনি, আবার নতুন চাকরির সুযোগও ক্রমে সংকুচিত হচ্ছে। এই মধ্যবর্তী অবস্থানেই আটকে পড়া কর্মজীবীদের বলা হচ্ছে স্যান্ডউইচ জেনারেশন।
এই সংকটের বাস্তব চিত্র শুধু অনুভূতির জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়, পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট। ২০২৫ সালে ফোর্বস প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সী কর্মীদের অর্ধেকের বেশি অবসরের আগেই চাকরি হারান বা ছাঁটাইয়ের শিকার হন। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, তাঁদের অধিকাংশই পরে আগের মতো বেতন কিংবা পদমর্যাদা আর ফিরে পান না। এই চিত্র শুধু যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতে সাম্প্রতিক ছাঁটাইয়ে ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সী কর্মীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
এই বয়সেই জীবনের আর্থিক চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। সন্তানের শিক্ষা ব্যয়, বাড়ি বা গাড়ির ঋণ, পাশাপাশি বয়স্ক মা–বাবার চিকিৎসা ও দেখভালের খরচ বহন করতে হয়। ফলে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের বহু পেশাজীবীর কাছেও এই বাস্তবতা অচেনা নয়। আয় অনিশ্চিত হয়ে পড়লে পুরো পরিবারের ভারসাম্য নড়বড়ে হয়ে যায়।
এই পরিস্থিতির পেছনে একটি বড় কারণ হলো কর্মক্ষেত্রে বয়সভিত্তিক বৈষম্য, যা খুব নীরবে কাজ করে। ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তে প্রথমেই নজরে আসেন বেশি বেতন পাওয়া কর্মীরা। সিনিয়র পদবির আড়ালে বয়স ৪০ পেরোলেই অনেককে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় ফেলে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনেক জুনিয়র কর্মীর কাজ সহজ করে দিচ্ছে, কিন্তু মাঝামাঝি পর্যায়ের পেশাজীবীদের জন্য স্থায়িত্ব দিন দিন কমে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মানবসম্পদ বিষয়ক সংগঠন সোসাইটি ফর হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট জানায়, ৫০ বছরের বেশি বয়সী প্রায় ২৬ শতাংশ কর্মী সম্প্রতি বয়স নিয়ে কটাক্ষ বা নেতিবাচক মন্তব্যের শিকার হয়েছেন। আবার আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব রিটায়ার্ড পারসনস–এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দুই–তৃতীয়াংশ প্রবীণ কর্মী জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এই ধরনের বৈষম্য প্রত্যক্ষ করেছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় স্যান্ডউইচ দায়িত্ব, একদিকে সন্তান, অন্যদিকে মা–বাবা। এতে সময়, শক্তি এবং মানসিক সক্ষমতা দ্রুত ক্ষয় হতে থাকে।
তবু এই সংকটের মাঝেও পথ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং নিজের অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে কাজে লাগানোর কৌশল। ডিজিটাল আপস্কিলিং এখন সময়ের দাবি। অনলাইন কোর্স বা সার্টিফিকেট বয়স নয়, দক্ষতার প্রমাণ দেয়। নতুন প্রযুক্তি ও টুল আয়ত্তে আনা মানে নিজেকে হালনাগাদ রাখা।
পুরোপুরি চাকরি বদলানো সম্ভব না হলে ফ্রিল্যান্সিং বা সাইড গিগ একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে। পরামর্শ দেওয়া, প্রজেক্টভিত্তিক কাজ বা খণ্ডকালীন দায়িত্বে বয়স নয়, কাজের মানই মূল বিবেচ্য। একই সঙ্গে নেটওয়ার্কিং নতুনভাবে ভাবা জরুরি। পুরোনো সহকর্মী, অ্যালামনাই গ্রুপ কিংবা ৪০ বছরের বেশি বয়সী পেশাজীবীদের অনলাইন কমিউনিটি আগের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে পরামর্শক বা প্রশিক্ষকের পরিচয়ে রূপ দেওয়া আরেকটি সম্ভাব্য পথ। পাশাপাশি এই সময়ে বড় ঝুঁকির বিনিয়োগের চেয়ে দৈনন্দিন খরচ ও জরুরি স্বাস্থ্য ব্যয়ের জন্য সঞ্চয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্যান্ডউইচ জেনারেশনের চাকরি সংকট তাই শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক শ্রমবাজার বাস্তবতা। এই বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং পরিকল্পনাকেই প্রধান শক্তি হিসেবে সামনে আনতে হচ্ছে।




Add comment