যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সহিংস কৌশল নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। সম্প্রতি রাজধানী ওয়াশিংটনে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের আয়োজিত এক প্রকাশ্য ফোরামে একাধিক ভুক্তভোগী ও নিহতদের স্বজনেরা তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাঁদের বর্ণনায় উঠে আসে অভিবাসন সংক্রান্ত অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ, যা ব্যক্তিগত জীবন ও পুরো সম্প্রদায়কে স্থায়ীভাবে বদলে দিয়েছে।
গত জানুয়ারিতে মিনিয়াপোলিসে নিজ গাড়ির ভেতরে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থার এক কর্মকর্তার গুলিতে নিহত এক নারীর দুই ভাই ফোরামে আবেগঘন সাক্ষ্য দেন। তাঁদের ভাষায়, পরিবারের একজন সদস্যকে এভাবে হারানোর যন্ত্রণা শুধু ব্যক্তিগত শোক নয়, বরং একটি অপ্রয়োজনীয় ও সহিংস ঘটনার ফল। নিহতের এক ভাই বলেন, বোনকে হারানোর পর তাঁদের পরিবার অবিশ্বাস, মানসিক যন্ত্রণা ও পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তাঁর মতে, মিনিয়াপোলিসের রাস্তায় যা ঘটছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি ধারাবাহিক চিত্র, যা পুরো সমাজকে প্রভাবিত করছে।
এই হত্যাকাণ্ডের পর যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন প্রয়োগ নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও বিরোধিতা আরও তীব্র হয়। এর কয়েক সপ্তাহ পর সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে আরেক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এসব ঘটনার পর আইনপ্রণেতারা স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগে সংস্কার, জবাবদিহি এবং বিভাগটির শীর্ষ নেতৃত্বের পদত্যাগ দাবি করেন।
ফোরামে আরও বক্তব্য দেন শিকাগোর এক নারী, যিনি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এক কর্মকর্তার গুলিতে পাঁচবার আহত হয়েছিলেন। তিনি জানান, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর পর্যাপ্ত চিকিৎসা না দিয়েই তাঁকে হাসপাতাল থেকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়। তাঁর শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল, অথচ কর্মকর্তারা আলোচনা করছিলেন কোন কারাগার তাঁকে এই অবস্থায় নেবে। শেষ পর্যন্ত তাঁকে সঠিক চিকিৎসার জন্য আবার হাসপাতালে নেওয়ার অনুরোধ জানাতে হয়। তাঁর বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ আনা হলেও পরে সেই অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়।
আরেকজন মিনিয়াপোলিসের বাসিন্দা বলেন, তাঁকে গাড়ি থেকে টেনে নামানো হয়েছিল। ক্যালিফোর্নিয়ার সান বার্নার্ডিনো এলাকার এক মার্কিন নাগরিক জানান, তাঁর গাড়ির দিকে গুলি চালানো হয়। এসব বর্ণনা একত্রে অভিবাসন প্রয়োগ অভিযানে সহিংসতার একটি বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরে।
এই প্রকাশ্য ফোরামের আয়োজন করেন সিনেটের একটি স্থায়ী তদন্ত উপকমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য এবং প্রতিনিধি পরিষদের তদারকি ও সরকারি সংস্কার কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য। ফোরামে স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের কোনো প্রতিনিধি সাক্ষ্য দেননি। সংস্থাটি এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াও জানায়নি।
আইনপ্রণেতারা অভিযোগ করেন, স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ ও এর অধীন সংস্থাগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাঁদের মতে, যখন সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়, তখন কংগ্রেসের হস্তক্ষেপ করা দায়িত্ব। ডেমোক্র্যাটদের তৈরি এক ড্যাশবোর্ডে ৪৭০টির বেশি অভিবাসন প্রয়োগসংক্রান্ত ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৮৬টিতে কর্মকর্তাদের শক্তি প্রয়োগকে সমস্যাজনক বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের ভাষায়, এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ভুল নয়, বরং একটি স্পষ্ট প্রবণতার ইঙ্গিত।
ফোরামে বক্তারা আরও বলেন, নিহত ব্যক্তিদের জীবিত থাকলে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার সুযোগ থাকা উচিত ছিল। তাঁদের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় সংস্থার হাতেই তাঁদের প্রাণ গেছে। এই পরিস্থিতিতে শীর্ষ কর্মকর্তাদের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই এবং তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
এদিকে নিহত ও আহতদের ঘটনায় বিচার বিভাগ ফেডারেল নাগরিক অধিকার তদন্ত শুরু করেছে। পাশাপাশি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে তাঁর কমান্ডারের পদ থেকে সরিয়ে আগের কর্মস্থলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফেডারেল বাহিনীর উপস্থিতি কমানোর বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য আসায় পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
ফোরামে বক্তব্য দেওয়া শিকাগোর সেই নারী বলেন, সরকার দাবি করেছিল তারা সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু করছে। কিন্তু বাস্তবতায় সাধারণ নাগরিকরাই এসব অভিযানের শিকার হচ্ছেন। তাঁর মতে, এসব ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি তাঁর আস্থা ভেঙে দিয়েছে এবং প্রশাসনের তথ্য উপস্থাপনের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
এই সাক্ষ্যগুলো যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন প্রয়োগ নীতির ভবিষ্যৎ, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে আলোচনা জোরদার করেছে।







Add comment