মঙ্গল গ্রহের রহস্যময় বায়ুমণ্ডল নিয়ে মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। এই আগ্রহের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ২০২১ সালে পাঠিয়েছিল পারসিভিয়ারেন্স রোভার, যা মঙ্গলের বিভিন্ন ভৌগোলিক ও আবহাওয়াগত তথ্য সংগ্রহের জন্য কাজ করছে। সম্প্রতি এই রোভার প্রথমবারের মতো মঙ্গল গ্রহে বজ্রপাতের মতো একটি শব্দ ধারণ করেছে, যা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশেষভাবে গুরুত্ব বহন করছে।
নাসার তথ্যমতে, রোভারটি মূলত মঙ্গলের ধূলিময় বায়ুমণ্ডলে একটি ধূলিঝড়ের সময় ক্ষীণ বৈদ্যুতিক নির্গমনের আওয়াজ সংগ্রহ করেছে। যদিও পৃথিবীতে যেমন বজ্রপাতের গর্জন শোনা যায়, মঙ্গলে তা এতটা নাটকীয় নয়। তবুও রোভারটির সংবেদনশীল মাইক্রোফোন এই ক্ষীণ আওয়াজ ক্যাপচার করতে সক্ষম হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধান করছেন, মঙ্গল গ্রহের ধূলিময় বায়ুমণ্ডলে বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ বা বজ্রপাত ঘটতে পারে কি না। এবারই প্রথম সঠিকভাবে এই ধরনের শব্দের প্রমাণ মাইক্রোফোনে ধরা পড়ল। শব্দটি ধারণের সময় রোভারটি একটি ধূলিঝড়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। মঙ্গল গবেষণার এক বিজ্ঞানী জানান, সেন্টিমিটার আকারের ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গটি রোভার থেকে প্রায় ছয় ফুট দূরে ঘটেছিল।
নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, পারসিভিয়ারেন্স রোভার অন্যান্য পরীক্ষা চালানোর সময় অসাবধানতাবশত এই ক্ষীণ বৈদ্যুতিক শব্দ মাইক্রোফোনে ধরেছে। ফ্রান্সের ইনস্টিটিউট ফর রিসার্চ ইন অ্যাস্ট্রোফিজিকস অ্যান্ড প্ল্যানেটোলজির গবেষকেরা পারসিভিয়ারেন্স রোভারটির সুপারক্যাম যন্ত্র ব্যবহার করে দুই মঙ্গলীয় বছর বা প্রায় ১,৩৭৪ দিনের সমান সময় ধরে মোট ২৮ ঘণ্টার মাইক্রোফোন তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। এই বিশ্লেষণ থেকে দেখা গেছে, ধূলিঝড়ের সময় ধূলিকণা ও বালুর ঘর্ষণের কারণে বৈদ্যুতিক চার্জ এবং কর্কশ শব্দ সৃষ্টি হয়।
তবে নাসার রোভার দ্বারা ধারণ করা এই শব্দের প্রকৃত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নিয়ে এখনও কিছুটা সন্দেহ রয়েছে। এক বিজ্ঞানী উল্লেখ করেছেন, শুধুমাত্র শব্দ শোনা হওয়ার ভিত্তিতে মঙ্গলের বজ্রপাতের নিশ্চিততা বলা সম্ভব নয়। তবে এটি মঙ্গলীয় আবহাওয়া এবং বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ সম্পর্কে নতুন ধারণা দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
এই নতুন তথ্য মঙ্গল গ্রহের বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এর মাধ্যমে মঙ্গলীয় ধূলিঝড়ের বৈদ্যুতিক আচরণ, বায়ুমণ্ডলের বৈশিষ্ট্য এবং সম্ভাব্য বজ্রপাতের ধরণ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা সম্ভব হবে। গবেষকরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে আরও উন্নত মাইক্রোফোন এবং সেন্সর প্রযুক্তির মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াগুলি আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে।
মঙ্গল গ্রহের গবেষণা ও রোভার অভিযান চলমান থাকায় আগামী বছরগুলোতে এই ধরনের নতুন তথ্য প্রকাশিত হতে পারে, যা মানবজাতির গ্রহজ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করবে।



