মহাবিশ্বে মানুষের বাইরে অন্য কোনো প্রাণের অস্তিত্ব আছে কি না, এই প্রশ্ন বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। সেই অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটির কার্ল সেগান ইনস্টিটিউটের একদল গবেষক সম্প্রতি পৃথিবীর মতো বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ৪৫টি গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন। এসব গ্রহে ভিনগ্রহের প্রাণের বসবাসের জন্য উপযোগী পরিবেশ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গবেষণায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুনভাবে শনাক্ত হওয়া গ্রহগুলোর মধ্যে চারটি পৃথিবী থেকে তুলনামূলকভাবে খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। এই চারটি গ্রহের দূরত্ব প্রায় ৪০ আলোকবর্ষ। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ভাষায়, এসব গ্রহ তাদের নিজ নিজ নক্ষত্রের ‘হ্যাবিটেবল জোন’-এ অবস্থান করছে। অর্থাৎ, তারা এমন এক দূরত্বে রয়েছে যেখানে তাপমাত্রা অতিরিক্ত বেশি নয়, আবার অত্যন্ত কমও নয়।
এই অবস্থানই গ্রহগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ, নক্ষত্রের খুব কাছাকাছি হলে তাপমাত্রা এত বেশি হয় যে পানি বাষ্পে পরিণত হয়ে যায়। আবার খুব দূরে থাকলে তাপমাত্রা এত কমে যায় যে পানি বরফে পরিণত হয়। কিন্তু এই নতুন গ্রহগুলো এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ অঞ্চলে রয়েছে যেখানে পৃষ্ঠে তরল পানি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। আর বিজ্ঞানীদের মতে, তরল পানি প্রাণের অস্তিত্বের জন্য অন্যতম প্রধান শর্ত।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর সবচেয়ে কাছাকাছি থাকা এই চারটি গ্রহে বর্তমান প্রযুক্তি ব্যবহার করে পৌঁছাতে প্রায় আট লাখ বছর সময় লাগতে পারে। এই দীর্ঘ সময়ের কারণ হলো বর্তমান মহাকাশযানের সীমিত গতি। তবে গবেষকরা আশাবাদী, ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তির উদ্ভাবন হলে এই সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
বিশেষ করে নিউক্লিয়ার পালস প্রপালশন প্রযুক্তির মতো উদ্ভাবন ব্যবহার করা গেলে কয়েক শতাব্দীর মধ্যেই এসব দূরবর্তী গ্রহে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। যদিও এই প্রযুক্তি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে, তবুও এটি মহাকাশ গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
গবেষকরা আরও মনে করছেন, ভিনগ্রহের প্রাণের সন্ধান শুধু দূরবর্তী নক্ষত্রমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের নিজস্ব সৌরজগতেও প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ প্রসঙ্গে এক মহাকাশ বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, শনি ও বৃহস্পতি গ্রহের কিছু উপগ্রহের বরফস্তরের নিচে বিশাল সমুদ্র থাকতে পারে, যেখানে প্রাণের জন্য অনুকূল পরিবেশ থাকতে পারে।
এই ধারণা বিজ্ঞানীদের নতুনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করছে। কারণ, বরফে আচ্ছাদিত এই উপগ্রহগুলোর অভ্যন্তরে থাকা তরল পানির অস্তিত্ব প্রমাণিত হলে, সেখানে অণুজীব বা অন্য কোনো প্রাথমিক জীবের অস্তিত্ব পাওয়া যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, নতুন করে ৪৫টি পৃথিবীসদৃশ গ্রহের সন্ধান মহাবিশ্বে প্রাণের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। যদিও এসব গ্রহে সরাসরি পৌঁছানো এখনো অনেক দূরের বিষয়, তবুও এই আবিষ্কার মানবজাতির মহাকাশ অনুসন্ধানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।





Add comment