Bp News USA

১৭৭৬-এর দলিল বদলে দিল বিশ্বরাজনীতি

বিশ্বের স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর জন্মের ইতিহাসে রয়েছে সংগ্রাম, ত্যাগ আর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অনন্য সব অধ্যায়। সেই ইতিহাসের ধারাবাহিক বিশ্লেষণের প্রথম পর্বে উঠে আসে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, যা শুধু একটি দেশের জন্মলিপি নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন ধারার সূচনা হিসেবে বিবেচিত।

১৮২৬ সালে মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে এক চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা একজন প্রেসিডেন্ট মন্তব্য করেছিলেন, ১৭৭৬ সালের ঘোষণাপত্র একদিন বিশ্ব ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করবে। সময় প্রমাণ করেছে, তাঁর এই মন্তব্য অতিরঞ্জিত ছিল না। কারণ, এই দলিল কেবল একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল না; এটি পরাধীন জাতিগুলোর জন্য একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। ইউরোপ, ক্যারিবিয়ান ও লাতিন আমেরিকার প্রায় ২০টি জাতি পরবর্তীকালে নিজেদের স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে গিয়ে এই নথি থেকে অনুপ্রেরণা নেয়।

আজ বিশ্বের বহু দেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সেই প্রাচীন দলিলের কাঠামো ও ভাষার ছাপ স্পষ্ট। উপনিবেশবাদের শৃঙ্খল ভেঙে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আইনি স্বীকৃতি আদায়ের ক্ষেত্রে এটি ছিল যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য সে সময়কার রাজনৈতিক বাস্তবতায় নজর দেওয়া প্রয়োজন। তখন উত্তর আমেরিকার ১৩টি উপনিবেশ ব্রিটিশ শাসনের অধীন। অতিরিক্ত কর আর বৈষম্যমূলক নীতির কারণে উপনিবেশগুলোতে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। ১৭৭৬ সালের ৭ জুন কংগ্রেসে এক প্রস্তাব উত্থাপিত হয়, যেখানে উপনিবেশগুলোকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং বিদেশি শক্তির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ার আহ্বান জানানো হয়।

সেই সময় ব্রিটিশদের সঙ্গে চলমান সংঘাতকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অনেকেই সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ হিসেবে দেখছিলেন। নেতৃবৃন্দ বুঝতে পারেন, আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণা ছাড়া ফ্রান্স বা স্পেনের মতো শক্তিশালী দেশের সমর্থন পাওয়া কঠিন হবে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন ছিল তাই কৌশলগতভাবে অপরিহার্য।

এই লক্ষ্য সামনে রেখে আন্তর্জাতিক আইনের নীতিমালা সতর্কতার সঙ্গে অনুসরণ করা হয়। বিশেষ করে সুইস আইনবিদ এমের দে ভ্যাটেলের তত্ত্ব গুরুত্ব পায়। সে সময়ের আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী, স্বাধীন রাষ্ট্র বলতে এমন সত্ত্বাকে বোঝাত যার ওপর অন্য কোনো বিদেশি শক্তির কর্তৃত্ব নেই এবং যে অন্যান্য রাষ্ট্রের সমান অধিকার ভোগ করে। প্রতিষ্ঠাতা নেতারা এই নীতিগুলো মাথায় রেখেই নতুন রাষ্ট্র কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করেন।

ঘোষণাপত্রের খসড়া প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় তরুণ এক আইনপ্রণেতাকে। নথিতে ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় জর্জের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারী আচরণের বিস্তৃত অভিযোগ তুলে ধরা হয় এবং শেষে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রাথমিক খসড়ায় দাসপ্রথার কড়া সমালোচনা ছিল এবং একে অমানবিক অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল।

তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন পথে নিয়ে যায়। বিশেষ করে দক্ষিণ ক্যারোলাইনা ও জর্জিয়ার মতো অঙ্গরাজ্যের আপত্তির মুখে চূড়ান্ত দলিল থেকে দাসপ্রথাবিরোধী অংশ বাদ দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্ত ঘোষণাপত্রটির ভেতর এক ধরনের স্ববিরোধিতার জন্ম দেয়।

এই দলিলের মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো ‘দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা’ নামটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আত্মপ্রকাশ করে। ঘোষণাপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে তারা যুদ্ধ ঘোষণা, শান্তিচুক্তি, কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন এবং বাণিজ্য পরিচালনার পূর্ণ আইনি অধিকার রাখে।

শুরুর দিকে এই ঘোষণাপত্রের মূল লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন। ‘সকল মানুষ সমান’ কিংবা জীবন, স্বাধীনতা ও সুখের অন্বেষণের মতো মানবাধিকারের নীতিগুলো তখন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির তুলনায় আড়ালেই ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে এক প্রেসিডেন্ট এবং এক খ্যাতিমান দাসপ্রথাবিরোধী নেতার মতো ব্যক্তিত্বরা এই দলিলের মানবাধিকার বিষয়ক নীতিগুলোকে আন্দোলনের প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। ফলে ঘোষণাপত্রটির তাৎপর্য নতুন মাত্রা পায়। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক ঘোষণা নয়, বরং মানবাধিকারের বিশ্বজনীন ইশতেহারে পরিণত হয়।

এভাবেই ১৭৭৬ সালের সেই দলিল বিশ্বরাজনীতিতে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করে, যা আজও স্বাধীনতার সংগ্রামে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচিত।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed