ইতালির একটি গুহা থেকে উদ্ধার হওয়া প্রায় ১২ হাজার বছরের পুরোনো দুই মানবকঙ্কাল নিয়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় মিলেছে বিস্ময়কর তথ্য। বহু বছর ধরে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষিত থাকা এই কঙ্কাল দুটি আধুনিক জিনতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গবেষণায় জানা গেছে, কঙ্কাল দুটি ছিল এক মা ও তার মেয়ের এবং তারা ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন বিরল জিনগত রোগে আক্রান্ত ছিলেন।
১৯৬৩ সালে ইতালির রোমিটো গুহায় প্রত্নতাত্ত্বিকদের একটি দল এই দুটি কঙ্কাল আবিষ্কার করেন। দীর্ঘ সময় ধরে এগুলো কেবল অতীত মানবসমাজের নিদর্শন হিসেবেই বিবেচিত ছিল। তবে আধুনিক জিনতত্ত্বের অগ্রগতির ফলে সাম্প্রতিক সময়ে গবেষকেরা এই কঙ্কাল দুটি থেকে গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন।
পর্তুগালের কোয়েমব্রা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নৃবিজ্ঞানীর নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় কঙ্কাল দুটির বাঁ কানের অভ্যন্তরীণ অংশ থেকে প্রাচীন ডিএনএ সংগ্রহ করা হয়। এরপর সেই ডিএনএর জেনেটিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা যায়, এই দুই ব্যক্তি আসলে মা ও মেয়ে ছিলেন। গবেষকেরা আরও নিশ্চিত হন যে তারা উভয়েই অ্যাক্রোমেসোমেলিক ডিসপ্লাসিয়া নামে পরিচিত এএমডিএম নামের একটি বিরল জিনগত রোগে আক্রান্ত ছিলেন। এ রোগের কারণে তাদের উচ্চতা স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল।
গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাময়িকী দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এএমডিএম রোগে আক্রান্ত হলে মানুষের হাড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। সাধারণত এনপিআর২ নামের একটি নির্দিষ্ট জিনে মিউটেশনের কারণে এই রোগের সৃষ্টি হয়। বিশ্লেষণে জানা গেছে, মেয়েটির শরীরে ওই জিনের দুটি ত্রুটিপূর্ণ মিউটেশন ছিল। এর ফলে তার শরীরের হাড়ের গঠন এবং সামগ্রিক শারীরিক বৃদ্ধি মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল।
অন্যদিকে তার মায়ের শরীরে ওই জিনের একটি মাত্র মিউটেশন ছিল। এ ধরনের অবস্থাকে হেটেরোজাইগাস বলা হয়। এ কারণে তার উচ্চতা মেয়ের তুলনায় কিছুটা বেশি হলেও স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় কম ছিল।
গবেষকদের মতে, ওই সময়কার সমাজে এমন শারীরিক অবস্থায় বেঁচে থাকা সহজ ছিল না। এএমডিএম রোগে আক্রান্ত মেয়েটির পক্ষে শিকার সংগ্রহ করা, দীর্ঘ পথ অতিক্রম করা কিংবা ভারী শারীরিক শ্রম দেওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। তবু কঙ্কালের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কিশোরী বয়সে সে অন্যদের মতোই পর্যাপ্ত পুষ্টি পেয়েছিল।
গবেষণা দলের নেতৃত্ব দেওয়া নৃবিজ্ঞানী এ বিষয়ে বলেন, সেই সময়কার সমাজে মেয়েটির দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। এটি বোঝায় যে তার পরিবার ও গোষ্ঠীর সদস্যরা তাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং যত্ন প্রদান করেছিল। অর্থাৎ প্রাচীন মানবসমাজেও শারীরিকভাবে দুর্বল বা ভিন্ন সক্ষমতার মানুষদের প্রতি সহমর্মিতা ও সহায়তার প্রবণতা ছিল।
গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে নিয়ে এসেছে। তা হলো বিরল জিনগত রোগ কেবল আধুনিক সময়ের সমস্যা নয়। মানব ইতিহাসের বহু প্রাচীন সময় থেকেই এসব রোগ মানুষের শরীরে বিদ্যমান ছিল।
ইউরোপের একটি বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের এক চিকিৎসকের মতে, এ ধরনের গবেষণা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জিনগত রোগের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া গেলে বর্তমান সময়ে এমন বিরল ও জটিল শারীরিক অবস্থাকে আরও ভালোভাবে শনাক্ত করা এবং চিকিৎসা উন্নত করার ক্ষেত্রে তা সহায়ক হতে পারে।
এই গবেষণা তাই শুধু প্রাচীন মানব ইতিহাস নয়, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্যও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এনে দিয়েছে।





Add comment