Bp News USA

১০ হাজার ভৌতিক তদন্তের গল্প

অতিপ্রাকৃত ঘটনার অনুসন্ধান যে গবেষণার কাঠামোর ভেতর আনা সম্ভব, তা বিশ্বকে প্রথম দেখিয়েছিলেন এক মার্কিন দম্পতি। ভয়, কৌতূহল ও বিশ্বাসকে সঙ্গী করে তাঁরা প্রবেশ করেছিলেন এক অদৃশ্য জগতে। সাহায্য করেছেন অসংখ্য পরিবারকে, পাশাপাশি মুখোমুখি হয়েছেন সমালোচনারও। জনপ্রিয় হরর ফ্র্যাঞ্চাইজি The Conjuring Universe–এর গল্পের পেছনেও রয়েছে তাঁদের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা। এই দম্পতিই হলেন প্যারানরমাল তদন্তকারী এড ও লরেইন ওয়ারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কানেটিকাট অঙ্গরাজ্যের সমুদ্রবন্দর শহর ব্রিজপোর্টে জন্ম এডের। ১৯২৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর এক ক্যাথলিক পরিবারে তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন তিনি। পাঁচ বছর বয়সে অপরিচিত ছায়ামূর্তি দেখা, গভীর রাতে অজানা কণ্ঠস্বর শোনা কিংবা বাড়ির বারান্দায় নারীর অবয়বের উপস্থিতি টের পাওয়া ছিল তাঁর কাছে প্রায় নিয়মিত ঘটনা। বাস্তববাদী পুলিশ কর্মকর্তা বাবা এসবকে কল্পনা বলে উড়িয়ে দিলেও নিজের অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করতে পারেননি এড।

একই শহরে ১৯২৭ সালের ৩১ জানুয়ারি জন্ম নেন লরেইন। ছোটবেলা থেকেই তিনিও অদৃশ্য উপস্থিতি অনুভব করতেন, কখনো আগাম কিছু ঘটনার আভাস দিতেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে ধ্যানচর্চার মাধ্যমে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন তিনি। অতিপ্রাকৃত বিষয়ে তাঁদের দুজনের অভিজ্ঞতা ও কৌতূহলই পরে এক সূত্রে গেঁথে দেয়।

১৯৪০–এর দশকে ব্রিজপোর্টের এক থিয়েটারে কাজ করার সময় তাঁদের প্রথম দেখা। পরিচয় থেকে সম্পর্ক, এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৫ সালের ২২ মে বিয়ে। তাঁদের একমাত্র মেয়ে জুডির জন্ম হয় বিয়ের দুই বছরের মাথায়।

বিয়ের পর বাড়ি রং করার কাজের পাশাপাশি এড ছবি আঁকতেন, বিশেষ করে কথিত ভুতুড়ে বাড়ির ছবি। কোনো বাড়ি নিয়ে গুজব শুনলেই স্ত্রীকে নিয়ে সেখানে যেতেন। বাড়ির মালিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে আসত ভয়ংকর সব অভিজ্ঞতা। এসব নথিভুক্ত করতে শুরু করেন তাঁরা। সাক্ষাৎকার, টেপ রেকর্ডিং, ছবি সংগ্রহ—সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে এক পদ্ধতিগত অনুসন্ধান।

ধর্মীয় বিশ্বাস থেকেও তাঁরা শক্তি পেয়েছিলেন। তাঁদের মতে, সব ভৌতিক অভিজ্ঞতার পেছনে কেবল মৃত আত্মা নয়, কখনো অশুভ শক্তিও থাকতে পারে। প্রমাণ সংগ্রহের পর স্থানীয় গির্জার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন তাঁরা। সময়ের সঙ্গে গির্জার আস্থা অর্জন করেন এবং প্রয়োজন হলে ধর্মীয় আচার পালনের অনুমতিও পেতেন।

১৯৫২ সালে তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেন New England Society for Psychic Research। সংক্ষেপে এনইএসপিআর নামে পরিচিত এই সংস্থা অতিপ্রাকৃত ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কাজ করত। এড নিজেকে স্বশিক্ষিত ডেমোনোলজিস্ট হিসেবে পরিচয় দিতেন।

১৯৭০–এর দশকে কানেটিকাটের এক ফ্ল্যাটে দুই তরুণীর অভিজ্ঞতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল একটি পুতুল, পরে যা ‘অ্যানাবেল’ নামে পরিচিতি পায়। অদ্ভুত নড়াচড়া, কাগজে লেখা বার্তা ও শারীরিক আঘাতের অভিযোগের পর পুতুলটি নিজেদের সংগ্রহে নেন ওয়ারেন দম্পতি। তাঁদের বাড়ির কাচঘেরা বাক্সে সংরক্ষিত হয় সেটি, যার ওপর লেখা ছিল সতর্কবার্তা। এই পুতুলকে ঘিরেই পরবর্তীতে নির্মিত হয় একাধিক চলচ্চিত্র।

সবচেয়ে আলোচিত তদন্তগুলোর একটি ছিল নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের অ্যামিটিভিলের একটি বাড়ি। হত্যাকাণ্ডের এক বছর পর নতুন বাসিন্দারা সেখানে অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। তদন্ত, ছবি ও সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে বিষয়টি নথিভুক্ত করেন ওয়ারেন দম্পতি। ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে এবং ১৯৭৯ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে এ নিয়ে নির্মিত হয় প্রায় ৬০টি চলচ্চিত্র।

তাঁদের কাজ যেমন প্রশংসিত হয়েছে, তেমনি সমালোচনার মুখেও পড়েছে। সন্দেহপ্রবণ গবেষকেরা কয়েকটি ঘটনার প্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে সহায়তা পাওয়া অনেক পরিবার মানসিক স্বস্তি ও সমাধানের দাবি করেছে।

দীর্ঘ কর্মজীবনে প্রায় ১০ হাজারের বেশি অতিপ্রাকৃত ঘটনার তদন্ত করেছেন এই দম্পতি। তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নির্মিত হয়েছে The Conjuring, Annabelle, The Nun–সহ একাধিক চলচ্চিত্র।

তদন্ত চলাকালে সংগৃহীত বস্তু দিয়ে কানেটিকাটের মনরোয় গড়ে তোলেন একটি অলৌকিক জাদুঘর। ২০০৬ সালে এডের মৃত্যু এবং ২০১৯ সালে লরেইনের প্রয়াণের পর নিরাপত্তাজনিত কারণে জাদুঘরটি বন্ধ করা হয়। ২০২৫ সালে এটি নতুন মালিকানায় গেছে এবং ভবিষ্যতে পুনরায় উন্মুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।

অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস করুন বা না করুন, মার্কিন এই দম্পতির জীবনকাহিনি গবেষণা, বিতর্ক ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed