মরুভূমি ও পর্বতমালায় ঘেরা সিনাই উপদ্বীপ দীর্ঘদিন ধরেই ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনন্য ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত। হাজার বছরের নানা কাহিনি ও সভ্যতার স্মৃতি বহন করে চলা এই অঞ্চল আবারও আলোচনায় এসেছে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের মাধ্যমে। সম্প্রতি সেখানে প্রায় ১০ হাজার বছর পুরোনো একটি পুরাকীর্তিস্থলের সন্ধান মিলেছে, যেখানে শিলার ওপর খোদাই ও অঙ্কিত প্রাচীন চিত্রকর্ম পাওয়া গেছে।
সিনাই উপদ্বীপ অবস্থিত মিসর-এ। এর সীমানার কাছেই রয়েছে ইসরায়েল এবং গাজা উপত্যকা। ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে অঞ্চলটি বহু বছর ধরেই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় উপদ্বীপটি দখলে নেয় ইসরায়েল। পরে ১৯৮২ সালে একটি চুক্তির মাধ্যমে সিনাই আবার মিসরের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসে। এই ঐতিহাসিক পটভূমির মধ্যেই নতুন প্রত্নস্থল আবিষ্কারের তথ্য প্রকাশ করেছে দেশটির পর্যটন ও পুরাকীর্তিবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, নতুন আবিষ্কৃত স্থানটি সিনাইয়ের উম ইরাক মালভূমিতে অবস্থিত। সেখানে প্রায় ১০০ মিটার দীর্ঘ একটি বিশাল শিলাস্তম্ভ বা শিলার কাঠামো রয়েছে। এই শিলার গায়ে খোদাই করা ও অঙ্কিত বিভিন্ন চিত্রকর্ম শনাক্ত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে শুরু করে ইসলামি যুগ পর্যন্ত মানুষের শিল্পচর্চার বিবর্তনের ধারাবাহিকতা এই চিত্রগুলোর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফলে এটি কেবল একটি প্রত্নস্থল নয়, বরং দীর্ঘ সময়ের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের দৃশ্যমান দলিল।
দেশটির সুপ্রিম কাউন্সিল অব অ্যান্টিকিউটিস সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার হিসেবে এই স্থানটিকে উল্লেখ করেছে। কাউন্সিলের মহাসচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন সন্ধান পাওয়া এলাকাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব যেমন গভীর, তেমনি এর শিল্পমূল্যও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বিভিন্ন সময়ের নিদর্শন একই স্থানে উপস্থিত থাকায় পুরো এলাকাটি যেন খোলা আকাশের নিচে একটি প্রাকৃতিক জাদুঘরে পরিণত হয়েছে।
প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শিলার কাঠামোর উপরের অংশে লাল রঙে অঙ্কিত অসংখ্য প্রাণীর অবয়ব ও বিভিন্ন চিহ্ন রয়েছে। পাশাপাশি খোদাই করা চিত্রে ফুটে উঠেছে প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনযাপন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের দৃশ্য। এসব চিত্রে শিকার, প্রাণী পালন বা সামাজিক কার্যকলাপের ইঙ্গিত পাওয়া যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে বোঝা যায়, ওই অঞ্চল একসময় মানুষের সক্রিয় বসতির অংশ ছিল।
শুধু বাহ্যিক চিত্রই নয়, কাঠামোর অভ্যন্তরেও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন মিলেছে। সেখানে দেয়ালের অবশেষ এবং আগুন জ্বালানোর চুলার চিহ্ন পাওয়া গেছে। এসব উপাদান ইঙ্গিত দেয় যে, মানুষ সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান করেছিল এবং এটি ছিল একটি স্থায়ী বা আধা-স্থায়ী আবাসস্থল। ফলে আবিষ্কৃত স্থানটি কেবল শিল্পচর্চার নিদর্শন নয়, বরং প্রাচীন বসতির প্রমাণও বহন করছে।
দেশটির পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্বমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই এলাকায় হাজার হাজার বছর ধরে বিভিন্ন সভ্যতার মানুষের বসবাসের প্রমাণ মিলেছে। তাঁর মতে, নতুন আবিষ্কার মিসরের প্রত্নসম্পদের ভাণ্ডারে এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হবে। এটি শুধু অতীতের ইতিহাস উন্মোচনেই সহায়ক নয়, বরং ভবিষ্যৎ গবেষণার ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।
এদিকে সিনাইয়ের সেন্ট ক্যাথরিন শহরকে ঘিরেও একটি বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে কায়রো। ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত এই শহরকে আন্তর্জাতিক পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণীয় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলাই প্রকল্পটির উদ্দেশ্য। নতুন প্রত্নস্থল আবিষ্কার এই উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সিনাইয়ের মরুপ্রান্তরে আবিষ্কৃত এই শিলাচিত্র শুধু অতীতের শিল্পচর্চার সাক্ষ্য নয়, বরং মানব সভ্যতার ধারাবাহিক অগ্রযাত্রার নীরব দলিল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।







Add comment