মরুভূমির অনুর্বর বালুকে অল্প সময়ের মধ্যে চাষযোগ্য মাটিতে রূপান্তরের নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন চীনের বিজ্ঞানীরা। গবেষণাগারে তৈরি বিশেষ ধরনের অণুজীব প্রয়োগ করে তারা আলগা বালুকণাকে স্থিতিশীল ও উর্বর স্তরে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছেন। এ সংক্রান্ত গবেষণা আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী Soil Biology and Biochemistry এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে উত্তর পশ্চিম চীনের তাকলামাকান মরুভূমির সংলগ্ন এলাকায়। পরীক্ষামূলক প্লটে প্রক্রিয়াজাত বালুর ওপর একটি গাঢ় কালো আস্তরণ তৈরি হতে দেখা গেছে। সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা দীর্ঘ সময় ধরে প্রচণ্ড তাপমাত্রা ও তুষারপাতের মতো প্রতিকূল পরিবেশে বিভিন্ন প্লট পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, মাত্র ১০ থেকে ১৬ মাসের মধ্যে এই জৈব আস্তরণ বালুকে কার্যকর মাটিতে রূপান্তর করতে পারে।
গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া প্রতিষ্ঠান Chinese Academy of Sciences এর বিজ্ঞানীরা জানান, শুরুতেই তারা মাটির ভিত্তি শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন। কারণ, মরু অঞ্চলে রোপণ করা চারা গাছ বারবার নষ্ট হয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ ছিল স্থিতিশীল মাটির অভাব। নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রথমে এমন একটি ভিত্তি তৈরি করা হয়, যা উদ্ভিদের শিকড় বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলে।
এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সায়ানোব্যাকটেরিয়া নামের এক প্রাচীন অণুজীব। প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে আবির্ভূত হওয়া এই জীবাণু চরম প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে সক্ষম। সূর্যালোক ও বাতাস ব্যবহার করে এটি কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে এবং সাধারণ জৈব পদার্থ উৎপন্ন করে। মরুভূমির অনুর্বর বালুতে এ অণুজীব প্রয়োগের ফলে নাইট্রোজেন সংবদ্ধকরণ প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়। এর মাধ্যমে বাতাস থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে উদ্ভিদের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান তৈরি হয়। একই সঙ্গে এটি বালুকণাকে আঠার মতো একত্রে বেঁধে রাখে, যা শিকড় গজানোর উপযোগী স্থিতিশীল স্তর সৃষ্টি করে।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এই জৈব আস্তরণ বালুর পানি ধারণক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে। সাধারণ বালুতে বৃষ্টির পানি দ্রুত শুকিয়ে যায়, কিন্তু আস্তরণযুক্ত বালু আর্দ্রতা উপরিভাগের কাছাকাছি ধরে রাখতে পারে। এর কালো পিগমেন্ট সূর্যের তাপে বাষ্পীভবন কমিয়ে দেয়। ফলে চারাগাছ অতিরিক্ত কয়েক দিন সময় পায় শিকড় বিস্তারের জন্য।
প্রথম বছরের মধ্যেই দেখা যায়, এই জৈব স্তর পুষ্টি উপাদান উড়ে যাওয়া কমিয়ে দেয় এবং মাটির উপরিভাগের প্রায় এক ইঞ্চি স্তরে নাইট্রোজেন ও ফসফরাস সঞ্চিত হতে শুরু করে। অর্থাৎ বালু শুধু স্থিতিশীলই হচ্ছে না, ধীরে ধীরে উর্বর মাটির বৈশিষ্ট্য অর্জন করছে।
গবেষণাগার পর্যায়ে পরিচালিত পরীক্ষায় আরও দেখা গেছে, এই কৃত্রিম আস্তরণ ব্যবহারের ফলে বায়ুপ্রবাহজনিত মাটিক্ষয় ৯০ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে। মরু অঞ্চলে ধূলিঝড়ের প্রকোপ কমাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এ প্রযুক্তি প্রয়োগ করা গেলে মরুভূমির বিস্তার রোধ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সার্বিকভাবে গবেষণাটি দেখিয়েছে, প্রাচীন অণুজীবভিত্তিক জৈব প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বল্প সময়ে মরুভূমির বালুকে উৎপাদনক্ষম মাটিতে রূপান্তর করা সম্ভব। কঠোর জলবায়ু পরিস্থিতির মধ্যেও কার্যকর থাকা এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে শুষ্ক ও অনুর্বর অঞ্চলে কৃষি সম্ভাবনা বাড়াতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।







Add comment