ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার পর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের জাহাজ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শনিবার রাতে ইরানের আধা সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সি এ তথ্য জানায়।
সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট জলসীমায় অবস্থানরত জাহাজগুলো ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ডস কোর আইআরজিসির পক্ষ থেকে বারবার সতর্কবার্তা পাচ্ছে। বার্তায় স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করতে পারবে না।
এ বিষয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সও একই ধরনের তথ্য প্রকাশ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌ মিশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে জানান, ভেরি হাই ফ্রিকোয়েন্সি বা ভিএইচএফ বেতারতরঙ্গের মাধ্যমে জাহাজগুলো আইআরজিসির কাছ থেকে বার্তা পাচ্ছে। সেখানে বলা হচ্ছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচলের অনুমতি নেই। তবে ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো নির্দেশ জারির বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
ইরান দীর্ঘদিন ধরেই হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছিল, তাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক হামলা হলে এই সরু কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। শনিবার সকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক হামলা শুরু করে। ওই হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা নিহত হন বলে জানা গেছে।
এই পরিস্থিতিতে তেহরান পাল্টা সামরিক জবাব দিচ্ছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা অব্যাহত রেখেছে। ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই হরমুজ প্রণালি বন্ধের পদক্ষেপ সামনে আসে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরে প্রবেশের একমাত্র সামুদ্রিক পথ। এর এক পাশে ইরান এবং অপর পাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত অবস্থিত। এই প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে, সেখান থেকে জাহাজগুলো আরব সাগর হয়ে ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস রপ্তানির ক্ষেত্রে এই পথের গুরুত্ব অপরিসীম।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রতিদিন আনুমানিক দুই কোটি ব্যারেল তেল এই পথ অতিক্রম করে। শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসও এ পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। সংস্থাটি হরমুজ প্রণালিকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট হিসেবে বর্ণনা করেছে।
বিশ্লেষকেরা আগেই সতর্ক করেছিলেন, এই প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছিল। রোববার সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৩ ডলারে পৌঁছেছে।
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস পূর্বাভাস দিয়েছিল, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে, তবে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করতে পারে। একইভাবে ভারতের ইকুইরাস সিকিউরিটিজ এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, এই সরবরাহ পথ বন্ধ হয়ে গেলে অপরিশোধিত তেলের মূল্য ৯৫ থেকে ১১০ ডলারের মধ্যে পৌঁছাতে পারে।
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। চলমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন বিশ্ব সম্প্রদায়ের নিবিড় নজরদারিতে রয়েছে।







Add comment