স্যাটেলাইট ধ্বংসাবশেষে বাড়ছে বৈজ্ঞানিক উদ্বেগ

পৃথিবীর কক্ষপথে ক্রমবর্ধমান স্যাটেলাইট কার্যক্রম নতুন এক পরিবেশগত প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১৫ হাজার সক্রিয় স্যাটেলাইট পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে। এসব স্যাটেলাইটের কার্যকাল সাধারণত কয়েক বছর স্থায়ী হয়। নির্ধারিত সময় শেষে এগুলোকে নিয়ন্ত্রিতভাবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করানো হয়, যেখানে ঘর্ষণের ফলে সেগুলো পুড়ে ধ্বংস হয়ে যায়। এতদিন এই প্রক্রিয়াকে তুলনামূলক নিরাপদ মনে করা হলেও সাম্প্রতিক গবেষণা বিজ্ঞানীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, স্যাটেলাইট বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরে প্রবেশের সময় সম্পূর্ণ পুড়ে যায় না, বরং অতি সূক্ষ্ম ধাতব কণায় ভেঙে যায়। ২০২৩ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ওপরের বায়ুমণ্ডলের অ্যারোসল কণার মধ্যে অ্যালুমিনিয়ামসহ বিভিন্ন ধাতব উপাদানের উপস্থিতি রয়েছে। স্যাটেলাইট নির্মাণে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়াম পুড়ে অ্যালুমিনা কণায় পরিণত হয়। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই অ্যালুমিনা কণা দীর্ঘ সময় ধরে বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে স্থির থাকতে পারে এবং ওজোন স্তরের রাসায়নিক ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট নির্মাণে ব্যবহৃত উপাদান সংক্রান্ত গোপনীয়তা। এসব স্যাটেলাইটে কী ধরনের ধাতু বা যৌগ ব্যবহার করা হয়, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য উন্মুক্ত না থাকায় ভবিষ্যৎ প্রভাব সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে পরিবেশগত ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণেও অনিশ্চয়তা থেকে যাচ্ছে।

বর্তমানে কক্ষপথে থাকা একটি বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটের ভি২ মিনি সংস্করণের ওজন প্রায় ৮০০ কেজি। প্রস্তাবিত ভি৩ মডেলটি একটি ছোট আকারের বিমানের সমপর্যায়ের ভারী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্যাটেলাইটের আকার ও ওজন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় উৎপন্ন ধাতব কণার পরিমাণও বাড়বে। বিজ্ঞানীদের অনুমান, ভবিষ্যতে যদি প্রায় ১০ লাখ স্যাটেলাইট পর্যায়ক্রমে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে পুড়ে যায়, তাহলে প্রায় এক টেরাগ্রাম বা ১০ লক্ষ টন অ্যালুমিনা কণা বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এত বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক পদার্থ ওপরের বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং ওজোন স্তয়ের ক্ষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শুধু বায়ুমণ্ডল নয়, মহাকাশের পরিবেশও ক্রমশ চাপের মুখে পড়ছে। কক্ষপথে স্যাটেলাইটের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকিও বাড়ছে। দ্য আউটার স্পেস ইনস্টিটিউটের ‘ক্র্যাশ ক্লক’ বিশ্লেষণ বলছে, সক্রিয়ভাবে সংঘর্ষ এড়ানোর প্রচেষ্টা বন্ধ হয়ে গেলে কয়েক দিনের মধ্যেই বড় ধরনের স্যাটেলাইট সংঘর্ষ ঘটতে পারে। এই পরিস্থিতি মহাকাশে ধ্বংসাবশেষের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে, যা ভবিষ্যৎ মহাকাশ মিশন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সব স্যাটেলাইট বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় পুরোপুরি পুড়ে ছাই হয়ে যায় না। কিছু অংশ বা ধ্বংসাবশেষ ভূপৃষ্ঠে আছড়ে পড়তে পারে। যদিও এ ধরনের ঘটনা তুলনামূলক বিরল, তবুও সম্ভাব্য ঝুঁকি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

মহাকাশ প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার বিশ্বকে সংযুক্ত ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় সমৃদ্ধ করলেও এর পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন গবেষকেরা। বায়ুমণ্ডল ও মহাকাশের ভারসাম্য রক্ষায় স্যাটেলাইট ব্যবস্থাপনা, উপাদান নির্বাচন এবং অবসান প্রক্রিয়া নিয়ে আরও গভীর বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed