খাবার সংরক্ষণের জন্য কোন ধরনের পাত্র ব্যবহার করা হবে, বিষয়টি অনেকের কাছে সাধারণ সিদ্ধান্ত মনে হতে পারে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকি, দৈনন্দিন অভ্যাস এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা। আমাদের রান্নাঘরে বহুদিন ধরে স্টেইনলেস স্টিলের পাত্রের আধিপত্য থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে কাচের জার ও এয়ারটাইট কনটেইনারের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। কেউ স্টিলের স্থায়িত্বকে অগ্রাধিকার দেন, আবার কেউ কাচের রাসায়নিক নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দেন। আলোচনাটি এখন আর শুধু ঐতিহ্য বনাম আধুনিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং প্রশ্ন উঠছে রাসায়নিক নিঃসরণ, তাপ সহনশীলতা, দাগ বা গন্ধ ধরে রাখা এবং ভাঙার ঝুঁকি নিয়ে। বর্তমানে অনেকেই আগেভাগে রান্না করে সংরক্ষণ করেন, ফ্রিজে রাখেন এবং পরে গরম করে খান। ফলে উপযুক্ত পাত্র নির্বাচন আগের তুলনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্টিলের কনটেইনার: দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যবহারবান্ধব
স্টেইনলেস স্টিল দীর্ঘদিন ধরে রান্নাঘরের অন্যতম ভরসাযোগ্য উপাদান। বাজারে ‘বিপিএ-ফ্রি’ শব্দটি জনপ্রিয় হওয়ার বহু আগেই স্টিলের ব্যবহার ছিল ব্যাপক। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো স্থায়িত্ব, রাসায়নিক নিরপেক্ষতা এবং সহজ বহনযোগ্যতা।
উন্নতমানের ফুড-গ্রেড স্টেইনলেস স্টিল, যেমন ৩০৪ বা ১৮/৮ গ্রেড, সাধারণত খাবারের সঙ্গে বিক্রিয়ায় জড়ায় না। ফলে ডাল, ভাত, তরকারি কিংবা সংরক্ষিত খাবার এতে রাখলে ক্ষতিকর উপাদান মিশে যাওয়ার আশঙ্কা খুব কম থাকে। প্লাস্টিকের মতো এতে বিপিএ বা ফথালেটজাতীয় ক্ষতিকর রাসায়নিক নেই। সঠিকভাবে ধোয়া ও শুকনো রাখলে স্টিলে ব্যাকটেরিয়া জমার প্রবণতাও কম। তেলচিটচিটে ভাব, দাগ বা গন্ধ দীর্ঘসময় ধরে থাকে না।
দৈনন্দিন ব্যবহারে স্টিলের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এর দৃঢ়তা। পড়ে গেলে সহজে ভাঙে না এবং বহনের সময় ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে না। অফিস, স্কুল, ভ্রমণ বা পিকনিকের জন্য তাই এটি জনপ্রিয় পছন্দ। তুলনামূলক হালকা হওয়ায় ব্যাগে বহন করাও সুবিধাজনক। আধুনিক অনেক স্টিল কনটেইনারে উন্নতমানের লিকপ্রুফ ঢাকনা থাকে, যা ঝাঁকুনির মধ্যেও খাবার বাইরে আসতে দেয় না।
তবে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। স্টিলের পাত্রে ভেতরের খাবার দেখা যায় না। ফলে ফ্রিজে রাখা একাধিক কনটেইনারের মধ্যে প্রয়োজনীয়টি খুঁজে পেতে বারবার ঢাকনা খুলতে হয়। এছাড়া মাইক্রোওয়েভে স্টিল ব্যবহার করা যায় না, তাই গরম করার আগে খাবার অন্য পাত্রে নিতে হয়। খুব বেশি অ্যাসিডিক খাবার দীর্ঘসময় ধরে রাখলে নিম্নমানের স্টিলে স্বাদের সামান্য পরিবর্তন হতে পারে, যদিও উন্নতমানের স্টিলে এ ঝুঁকি কম।
কাচের কনটেইনার: স্বচ্ছ ও রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয়
প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর প্রবণতার ফলে কাচের কনটেইনার আবার জনপ্রিয় হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো স্বচ্ছতা। এক নজরেই ভেতরের খাবার দেখা যায়। পাশাপাশি কাচকে সবচেয়ে নিরপেক্ষ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ফুড-গ্রেড কাচ রাসায়নিকভাবে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়। টক, ঝাল, নোনতা বা মসলাদার যেকোনো খাবারের সঙ্গে এর বিক্রিয়া হয় না। এতে গন্ধ, রং বা দাগ স্থায়ীভাবে জমে থাকে না। খাবারে কোনো রাসায়নিক উপাদান মিশে যাওয়ার আশঙ্কাও নেই। আধুনিক অনেক কাচের কনটেইনার সরাসরি ফ্রিজ থেকে মাইক্রোওয়েভ বা ওভেনে নেওয়া যায়, তবে ঢাকনা খুলে। এতে গরম করা সহজ হয়।
ফ্রিজে সংরক্ষণ, মিল প্রেপ, ফল বা রান্না করা খাবার কয়েকদিন রাখার ক্ষেত্রে কাচ বেশ কার্যকর। স্বচ্ছ হওয়ার কারণে খাবারের অবস্থা দ্রুত বোঝা যায়, ফলে নষ্ট হওয়ার আগেই ব্যবহার করা সম্ভব হয়।
তবে কাচের প্রধান দুর্বলতা হলো ভঙ্গুরতা। হাত ফসকে পড়লে ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। টেম্পারড বা বোরোসিলিকেট কাচ হলেও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। ওজন বেশি হওয়ায় প্রতিদিন বহন করাও কিছুটা অসুবিধাজনক। অধিকাংশ কাচের কনটেইনারের ঢাকনা প্লাস্টিক বা সিলিকনের হয়, যা সময়ের সঙ্গে দাগ বা গন্ধ ধরে রাখতে পারে।
কোনটি বেশি নিরাপদ
রাসায়নিক নিরাপত্তার দিক থেকে কাচ সামান্য এগিয়ে, বিশেষত অ্যাসিডিক খাবার দীর্ঘসময় রাখার ক্ষেত্রে। শারীরিক নিরাপত্তায় স্টিল এগিয়ে, কারণ এটি ভাঙে না এবং ধারালো টুকরায় পরিণত হয় না। পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে দুটিই প্রায় সমান, সঠিকভাবে ধোয়া হলে জীবাণু জমার সম্ভাবনা কম।
ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণ থেকে সিদ্ধান্ত নির্ভর করে প্রয়োজনের ওপর। বাইরে বহনের জন্য স্টিল সুবিধাজনক। ঘরে সংরক্ষণ ও গরম করার জন্য কাচ উপযোগী। অনেকেই তাই দুই ধরনের পাত্রই ব্যবহার করেন, পরিস্থিতি অনুযায়ী।
শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে নিরাপদ পছন্দ সেটাই, যা ফুড-গ্রেড মানসম্পন্ন, নিয়মিত পরিষ্কার রাখা যায় এবং দৈনন্দিন ব্যবহারে সুবিধাজনক।







Add comment